আন্তর্জাতিক নারী দিবস

নারী তুমি অনন্যা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২০, ১৮:২৩

নারীর ক্ষমতায়ন নাকি নারীর স্বায়ত্তশাসন—এ নিয়ে গবেষকমহলে এখন তোলপাড়। হবে নাই-বা কেন বলুন? ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বকে মুঠোবন্দি করতে নারী সদাব্যস্ত আজ। প্রতিনিয়তই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অমোঘ টান সে অনুভব করে। তাই, আজকের নারী প্রতিযোগিতা করে নিজের সঙ্গেই। সর্বংসহা, কোমলমতি স্টেরিওটাইপ খেতাবগুলো নারীর অভিধান থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বহু আগেই। ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’—এ ধরনের প্রচলিত বাক্যও যেন বেমানান ঠেকে নারীর কর্মোদ্দীপনাকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে। নারী দিবসের বিশেষ এই ফিচারটি লিখেছেন সামিয়া আসাদী

 

গৃহিণী নন মেকার

 

আটপৌঢ়ে গৃহিণী নয়, আজকের আধুনিক নারীকে বলা হয় হোমমেকার। মেকার শব্দটির সাথে নান্দনিকতার আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। এ নান্দনিকতাকেই নারী ফুটিয়ে তুলছেন প্রতি কাজে আন্তরিকতা দিয়ে। অন্দরসজ্জায় বাহারি রঙের দেয়ালগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ড, আসবাব আর শৌখিন সজ্জা সামগ্রীকে সাবজেক্ট ধরে চলে মেকারের শিল্পচর্চা। মাঝে-মাঝে কৃত্রিম আলোকচ্ছটা পরিপাটি ঘরে সংযোজন করে স্বপ্নীল আবেশ। মেকার খাবারের মেন্যু তৈরি করেন ব্যালেন্স-ডায়েটকে মাথায় রেখে। দেশি-বিদেশি রেসিপির শঙ্করে পরিবারের জন্য উপাদেয় রেসিপির জন্ম হয় তারই রসুই ঘরে। প্রায় বৃক্ষহীন এ নগরী আবারও যেন বাঁচার স্বপ্ন দেখে তার এক চিলতে সবুজ ব্যালকনি জুড়ে। ছোট্ট বারান্দায় ফোটা গোলাপ, রঙ্গন বা নাইটকুইনের দুর্লভ হাসিতে ভেসে যায় নাগরিক জড়া। ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’—বলেই শেল্ফজুড়ে থাকেন প্রিয় লেখকরা। সন্তানকে শুধু ক্লাসের পড়ায় সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। মননের বিকাশকেও প্রাধান্য দেন। ভালো ছাত্রের চেয়েও ভালো মানুষ হওয়া যে জরুরি সেই দীক্ষাই সন্তানকে দিতে চান সবার আগে। ক্লাসে প্রথম হওয়ার জন্য আর দশ জনের সাথে প্রতিযোগিতা নয়। প্রতিযোগিতা হবে নিজের সাথে নিজের, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য। এ শিক্ষাই দিতে চান পরের প্রজন্মকে।

 

ভোক্তা নয় উদ্যোক্তা

বাহারি পণ্য আর অফারে ফেঁপে থাকা কনজিউমার কালচারের প্রধান টার্গেট নারী। আধুনিক নারীরা নিজেদের এ কাতার থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। কনজিউমার বা ভোক্তার চেয়ে এন্টারপ্রেনার বা উদ্যোক্তা পরিচয়ে পরিচিত হতে বেশি সাবলীল বোধ করেন। সংসারের হাজারটা কাজের ভিড়ে নিজের বায়োলজিক্যাল প্রাইমটাইমকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে চান। বিনিয়োগ ক্ষুদ্র হলেও স্বপ্ন যে সাগর সমান। তাই তো বুটিক হাউজ, ইভেন্টম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং কিংবা মেকওভার সেলুন... মাধ্যম যাই হোক না কেন নিজের মেধা, মনন আর পরিশ্রমের সমন্বয় সাধন করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আজকের স্মার্ট নারী উদ্যোক্তারা ফেসবুকের মতো সোশাল মিডিয়াকে কাজে লাগাচ্ছেন। সেলফি তুলছেন নিজের হাতে তৈরি করা পণ্যটির সাথে। 

 

নিষ্ক্রিয় দর্শক নন, সমালোচক

 

ক্রিটিক বা গঠনমূলক সমালোচক পরিচয়ে পরিচিত হতে পিছপা নন আজকের নারী। পুরুষের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত তৈরির ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ দেখতে পাই আমরা। ঘর বা কর্মস্থল সবমহলেই তাই নারীর সরব উপস্থিতি। এমনকি গত্বাঁধা হিন্দি সিরিয়াল আর চটুল মুভির মতো জনসংস্কৃতির ফ্যাশনে বুদ হন না। বরং অভিনয়, নির্মাণশৈলী, অন্তর্নিহিত বক্তব্য নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনায় মেতে ওঠেন সামাজিক পরিসরে। বলিউডি নায়িকাদের ফ্যাশনের অনুকরণের চেয়ে নিজস্ব স্টাইলকেই বেশি প্রাধান্য দেন। কিটি পার্টির গসিপে অংশ নেওয়ার চেয়ে জোট বেঁধে দুস্থদের জন্য কিছু করতে উত্সাহ বোধ করেন।     

 

কর্মযজ্ঞের ভাণ্ডার

 

ক্ষুদ্র জীবনের মোড়ে মোড়ে রয়েছে কর্মের ভাণ্ডার। আধুনিক নারীর টু-ডু লিস্টে তাই জায়গা করে নিয়েছে রাশি রাশি কাজ। সময় ও যোগাযোগের সদ্ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নিজেকে ভাঙছেন বিভিন্ন চরিত্রে। পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন প্রতি স্তরে। কর্মস্থলের ঘড়ি আর কাজের মাত্রা যেমন সমান তালে চালাচ্ছেন, তেমনি কাঁচা বাজারের ফর্দে বাদ পড়ছে না মরিচ-ধনেপাতার সংযোজন। আবার দেয়ালের রঙের সাথে ভারসাম্য রেখে ঘরের পর্দার রং নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দেখাচ্ছেন মুন্সিয়ানা। পরিবারের প্রবীণ সদস্যের প্রয়োজনকে মাথায় রাখতে গিয়ে নবীন সদস্যরা বঞ্চিত যেন না হয় সে হিসাবও মিলিয়ে যাচ্ছেন নির্ভুলভাবে। এত সব হিসাবের মারপ্যাঁচেও শখের অর্কিডে যত্নের ছোঁয়া বুলিয়ে দিতে ভুল হয় না। এত কাজের ভিড়ে কখনো নুয়ে পড়েন না বা ভড়কে যান না। আধুনিক নারী সময়ের চেয়ে একধাপ এগিয়ে চলেন।

 

লেখক সিনিয়র প্রভাষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্ট্যাডিজ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি

                 মডেল      ফারহানা মিলি

               ছবি      মোহসীন আহমেদ কাওছার