জাহাজনির্মাণ শিল্প :উন্নয়নের নতুন সিঁড়ি

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২০, ২১:২৮

তানজিনা হারুন তন্বী ও নুশাখা ইসরাত

নদীবহুল এই বাংলাদেশ জাহাজনির্মাণ শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল সেই মুঘল যুগ থেকে। মাঝে এই খ্যাতি কমে গেলেও বর্তমানে তা আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। জাহাজ নির্মাণে এখন বাংলাদেশকে তুলনা দেওয়া হয় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের মতো দেশের সঙ্গে, যারা এই শিল্পে পৃথিবী খ্যাত। এরই মধ্যে বিশ্বের ১২টি দেশে জাহাজ রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ এবং আরো ৪১টি জাহাজ নির্মাণের চুক্তিও পেয়েছে।                      

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি জাহাজ নির্মাণকারী কোম্পানি আছে যার মধ্যে মাত্র দুটি কোম্পানি (আনন্দ শিপইয়ার্ড ও ওয়েস্টার্ন ম্যারিন শিপইয়ার্ড) বিদেশে জাহাজ রপ্তানি করে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ৪০টি জাহাজনির্মাণ করে আয় করে ১৮০ মিলিয়ন ডলার। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে জাহাজ রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করে ৩০.৪৫ মিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরের তুলনায় ৪৬০.৭৭% বেশি। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে আয় করে ৬৫.৬১ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৫-১৬ তে আয় করে ১৯.৮৯ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে বাংলাদেশের জাহাজনির্মাণ শিল্পের মার্কেট সাইজ ১৬ হাজার বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ যদি ১% মার্কেট শেয়ারও দখল করতে পারে তাহলে প্রতি অর্থবছরে আয় করতে পারবে ১৬ বিলিয়ন ডলার।

উন্নতির অনেক সুযোগ থাকলেও বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়ে পুরোপুরি উন্নতি করতে পারছে না এই লাভজনক খাতটি। জাহাজ নির্মাণে প্রয়োজনীয় কাঁচা দ্রব্যাদির মধ্যে ৮০% আমদানি করতে হয়, যে জন্য বেড়ে চলেছে খরচ কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না তহবিল। কারণ, মূলধনের অভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এছাড়াও সুদের পরিমাণ বেশি থাকায় (১২%-১৬%) লোন নেওয়াটাও উপযোগী নয় এ শিল্পের জন্য। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত কর্মীর অভাবেও অনেক পিছিয়ে আছে এ সম্ভাবনাময় শিল্পটি। তাছাড়া অন্যান্য সহায়ক ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকায় ডেলিভারি টাইমসহ খরচও বেশি লাগছে। কিছু ক্ষতিকর দিকও আছে এ খাতটির যার ফলে এটি আশাজনক উন্নতি করতে পারছে না। এ শিল্পে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে ১০.৬৪% কর্মীর বয়স ১৮র নিচে। আরো দেখা গেছে, ৮৬.৪৪% কর্মীই দাবি করছেন যে তারা কোনো ধরনের চিকিত্সা সুবিধা এবং সঠিক ক্ষতিপূরণ পান না। আর জাহাজের ক্ষতিকারক পদার্থগুলো পরিবেশ ও মানুষের চরম ক্ষতি করে। (সূত্র-Baseline Survey of YPSA)

সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় ‘জাহাজনির্মাণ শিল্প উন্নয়ন-২০১৯’ এর খসড়া উপস্থাপন করেছে যেখানে সরকার এ খাতের উন্নয়নের জন্য ০.৫৯ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও গত ৩ বছরে সরকার ৭ হাজার ৫০০ কর্মীর প্রশিক্ষণ দিয়েছে এ খাতের কর্মহার বাড়ানোর লক্ষ্যে।

২০২৬ নাগাদ শুধু ছোটো ও মধ্যম আকৃতির জাহাজের মার্কেট বেড়ে দাঁড়াবে ৪০০ বিলিয়ন ডলারে (বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা)। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আশাবাদী যে, তারা আগামী পাঁচ বছরে ১% মার্কেট শেয়ার নিয়ে নিতে পারবে, যার পরিমাণ হবে চার বিলিয়ন ডলার (প্রতি বছর) যা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে দাঁড় করাতে বিরাট ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সেজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এর আগেও দেরিতে প্রতিক্রিয়া করে বাংলাদেশ অনেক আধুনিক ও লাভজনক বাণিজ্যিক উন্নয়নের সুযোগ হারিয়েছে। তাই সরকারের উচিত এ সুযোগ না হারিয়ে অতিদ্রুত এ খাতের সমস্যাগুলো সমাধান করে এটিকে সাহায্য করা, যেন এটি এদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, ‘সময় এবং নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।’

n লেখক : শিক্ষার্থী, বিবিএ, ২য় বর্ষ, মার্কেটিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়