সিনজাত রহমান সানি
জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী ০-১৮ বছর বয়সী সকল মানব সন্তানই শিশু। বাংলাদেশের সরকারও সেই নীতি মেনে চলে। শিশু শুধু বয়সের মধ্যে বন্দি এক শরীর সর্বস্ব মানুষ নয়। শিশুর মধ্যে রয়েছে সুপ্ত সম্ভবনা যা সমাজ ও দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। শিশুর সম্ভাবনার এই ভিত্তি সূচনা লগ্নেই শুরু হয়। ০-১৮ বছরের মধ্যে প্রথম ছয়টি বছর শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় শিশুর বিকাশ ঘটে। শিশুর বিকাশে অনেকগুলো ধাপের মধ্যে খেলাধুলা অন্যতম। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি মূলত এই বয়সে ঘটে থাকে। কিন্তু খেলাধুলার জন্য সেই মাঠ পাওয়া এখন দুষ্কর ব্যাপার। মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস ফেলার জায়গাটুকু এখন দখলে। খেলার মাঠের অভাবে শৈশব-কৈশোরের সেই দুরন্তপনা ভুলে শিশুরা দিন দিন টিভি, কার্টুন আর কম্পিউটার গেমের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। মস্তিষ্কনির্ভর এইসব খেলায় শিশুরা দিন দিন অলস হয়ে পড়ছে। এতে করে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। শিশুরা অন্য জগতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
শৈশবের এই দিনগুলোতে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকায় শিশুর মানসিক আচরণেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়, তাছাড়া এর প্রভাব পরবর্তী জীবনেও পড়ে। দেখা যায়, অল্পতেই মেজাজ খিটখিটে, জেদি, আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। বাইরের পর্যাপ্ত বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়ায় মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে এবং ব্যায়ামের অভাবে মুটিয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস ও হূদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এক সময় ঢাকা শহরে অনেক খোলা জায়গা দেখা যেত যা খেলার মাঠ হিসাবে ব্যবহূত হতো। কিন্তু অপরিকল্পতিতভাবে দালানকোঠা নির্মাণের ফলে তা বিলুপ্ত হতে বসেছে। যতটুকু আছে আইনের কড়াকড়ির অভাবে তা দখলের পথে। জনসংখ্যার তুলনায় মাঠের পরিমাণ প্রতিনিয়ত কমছে। বিশেষ করে রাজধানীবাসীর কথা চিন্তা করে উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও দুর্যোগের কথা চিন্তা করে প্রত্যেক এলাকায় খোলা জায়গা রাখতে হবে। আগামী প্রজন্মের শিশুদের কথা চিন্তা করে ও একটি সুস্থ জাতি গঠনে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বিদ্যমান খেলার মাঠগুলো যেন না হারিয়ে যায় সেজন্য মাঠগুলোকে আনুষ্ঠানিক ও আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া। খেলার মাঠে খেলাধুলা ছাড়া অন্য কোনো অনুষ্ঠানের (যেমন যাত্রা, মেলা ইত্যাদি) অনুমতি না দেওয়া। প্রত্যেকটি খেলার মাঠ যাতে সব মৌসুমে খেলার উপযোগী থাকে সেজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রতিটি গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় প্রয়োজন অনুয়ায়ী এক বা একাধিক খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা, জনসংখ্যার অনুপাতে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবেই সম্ভব শিশু-কিশোরদের ভয়ানক ভার্চুয়াল জগত্ থেকে বাঁচানো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
