অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের মাতৃভাষা। হয়তো এই জন্যই আমাদের জীবনে ভাষার প্রভাব অনেক বেশি। অত্যন্ত গর্বের বিষয় হচ্ছে, এই বছরই আমরা মাতৃভাষা অর্জনের ৬৮ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, ৬৮ বছরের এই সুদীর্ঘ যাত্রা শেষেও আমরা সম্পূর্ণ বাংলায় একটানা কথা বলতে পারি না। ভাষা যেন তার পুরোনো সুতীব্র ভালোবাসার গতিতে নেই, তাই ’৬৮র বাংলা—আহ্বানে ভাষাকে আরো বেগবান করতে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া
কিছু শিক্ষার্থী। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন— মুজাহিদ হোসেন
১৯৫২ সাল থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছে কিন্তু বাংলা ভাষা আজও প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি বা সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারছে না। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষা পেয়েছি। বাংলা ভাষা আমরা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারছি না। বিভিন্ন জায়গায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও ডাক্তারদের কাছ ইংলিশ ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার হয়। ঢাকার আশপাশে যে কোনো রেস্টুরেন্টে তাকাইলে আগে ইংরেজি লেখা চোখে ভাসে তাহলে আমরা এত কষ্ট করে বাংলা ভাষার জন্য কেন রক্ত দিলাম। সুশীলসমাজের প্রতি আহ্বান সবার আগে বাংলা ভাষার ব্যবহার চাই।
আলিফ আল আজাদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ব আমাদের ভাষাকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মান কিন্তু আমরা বাঙালিরাই এখনো দেশীয় পর্যায় পর্যন্ত সম্মান দিতে পারিনি। এখনো এমন মানুষই বেশি, যারা অদ্ভুত শৈল্পিক বাংলা গানের চেয়ে অন্য দেশীয় গান শুনতেই পছন্দ করেন, গানের অর্থ বুঝুক আর নাই বা বুঝুক। আড্ডায় গান গাইতে বললে নির্দ্বিধায় দুই লাইন ইংরেজি গেয়ে মাথা দোলায়। ৬৮ বছর পার করলেও, ইতিহাস জানতে চাইলে গোটা পাঁচেক শহিদের নামই বলতে পারব না। তাদের আত্মত্যাগ আর বুঝব কী করে! আসুন বাঙালি হই, চোখে রঙিন চশমা না দিয়ে জীবনানন্দ-সুকান্তের চোখে বাংলা দেখি। বাংলায় ফিরে আসি। পরিচিত যে ডাকেই যায়—বাড়ি তো ফিরতেই হয় সন্ধ্যা হলে, তাই না?
নুসরাত তন্দ্রা
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া।
১৯৫২ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্যে পাকিস্তানি সাময়িক জান্তার বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে যা পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত। দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে বাংলা ভাষা প্রাণের বিনিময়ে সারা বিশ্বে একটি দুর্লভ মর্যাদা পেলেও বর্তমানে বাংলা ভাষায় চলছে অবাধ বিকৃতি। তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, আকাশ সংস্কৃতি ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের ফলে বাংলা ভাষার বিকৃতি চলছে, যা জাতির জন্য ভয়াবহ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজেদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সন্তানটি প্রমিথ বাংলায় কথা বলতে জানে না, কিন্তু এটাই যেন মা-বাবার জন্য গর্বের হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, আমরা সেই জাতি, যেই জাতি মাকে ‘মা’ বলে ডাকার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছি, যা ইতিহাসে বিরল। তাই এই ভাষার মহত্ত্বকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের ওপরই বর্তায়।
জোবায়ের আহমেদ
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ভাষা জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে আমাদের জীবনে বাংলার পথচলা ছয় দশকেরও বেশি সময়ের। এই বছরই বাংলা ভাষা পূরণ করতে যাচ্ছে অর্জনের ৬৮ বছর। কিন্তু অর্জনের এতটা বছর পরও আমরা সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় একটানা কথা বলতে পারি না। বাংলা ভাষায় এখন আমরা মিশিয়ে ফেলি অন্য অনেক বিদেশি ভাষা। তবে অর্জনের এত বছর পরে এসে বাংলা যাতে তার শুদ্ধতম রূপটি হারিয়ে না ফেলে ’৬৮-র বাংলা আহ্বানে বাংলা ভাষায় সঠিক ব্যবহার করা উচিত। বিদেশি ভাষা আমরা ব্যবহার করব কিন্তু এর যথেচ্ছ ব্যবহার না করে। যখন বাংলা বলব তখন শুধুই বাংলা এবং যখন বিদেশি ভাষা বলব তখন শুধুই বিদেশি ভাষা। কেননা, আমরা চাই বাংলা আমাদের মাঝে শুধু বাহ্যিকভাবেই নয় বরং আত্মিকভাবেও যুক্ত থাকুক।
মুসলিমা খাতুন
শিক্ষার্থী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
