৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস

দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২০, ১৯:৩১

  মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক

 

খেলার মাঠ থেকে এভারেস্ট। সর্বত্রই বিজয় নিশান উড়াচ্ছেন বাংলাদেশের নারীরা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিঙ্গ সমতা দূর করার দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ায় দ্বিতীয়। বর্তমানে কৃষি, সেবা ও শিল্প খাতে কাজ করছেন ২ কোটি নারী। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ষষ্ঠ। সংসদেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা।

দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ১৪৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। অর্থাত্ এশিয়ার অন্যান্য দেশের   তুলনায় নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ   অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে    এই সূচকের উন্নয়ন আশার সঞ্চার করে। সরকারের ১২ বছরে নারীর ক্ষমতায়নের অর্জন অনেক। বৈশ্বিক  স্বীকৃতিও কম নয়।

গত ১২ বছরে  নারীর ক্ষমতায়নে বেশ কিছু আইন-নীতি ও বিধিমালা তৈরি করেছে সরকার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং নীতিমালা ২০১৬, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নকল্পে কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২০১৫, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন-২০১৪, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৩, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭।

‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৬’ অনুযায়ী নারীর ক্ষমতায়নে ১৪৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে ভালো। বর্তমানে বিচারপতি, সচিব, ডেপুটি, রাষ্ট্রদূত, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, জেলা  প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। নারীদের উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতেও সহায়ক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মাতৃত্বকালীন ছুটি তিন মাস থেকে দুই ধাপে ছয় মাস করা, সন্তানের পরিচয়ে বাবার সঙ্গে মায়ের নাম যুক্ত করা, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে ছেলের পাশাপাশি এক জন নারী উদ্যোক্তা নিশ্চিত করা, মেয়েদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে ‘তথ্য আপা’ প্রকল্প চালু, নগরভিত্তিক  প্রান্তিক মহিলা উন্নয়ন প্রকল্প, নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন  প্রকল্প, অতি দরিদ্র ১০ লাখ মহিলার দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি বৃত্তিমূলক  প্রশিক্ষণ দেওয়া, নারী উদ্যোক্তাদের উত্পাদিত পণ্য ও সেবা দেশে বিক্রির জন্য নারীবান্ধব বিপণন নেটওয়ার্ক ‘জয়িতা’ গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া তৃণমূলের নারীদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী ১২ হাজার ৯৫৬টি পল্লী মাতৃস্বাস্থ্য  কেন্দ্রের  মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মা ও শিশুর যত্নসহ যাবতীয় বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ ও সুদমুক্ত  ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সমীক্ষা অনুযায়ী কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কর্মজীবী নারী কাজ করেন তিন গুণ। দেশের অভ্যন্তরে অর্থনীতির মূল কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান ক্রমাগত বাড়ছে। সমীক্ষা অনুসারে, মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উত্পাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এখন নারী। কৃষি, শিল্প, সেবা খাতসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়লেও জাতীয়ভাবে পিছিয়ে আছেন তারা। কায়িক শ্রমে নারীদের অংশ নেওয়ার হার অব্যাহত রয়েছে।

সরকারি সংস্থা বিআইডিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, জিডিপিতে কর্মজীবী নারীদের অবদান ২০ শতাংশ। শুধু তাই নয়, অর্থনীতিতে নারীদের অবদান বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন সমীক্ষার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী অর্থনীতির সূচকের তিন খাত—কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করছেন। অর্থনীতিতে নারীর সাফল্য বেড়েছে, নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উত্পাদন ব্যবস্থায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উত্পাদন খাতে মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এখন নারী। এখানে ৫০ লাখ ১৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করেন। তাদের মধ্যে নারী ২২ লাখ ১৭ হাজার। তবে নারী কর্মীদের সিংহ ভাগই শ্রমজীবী। বাকিদের মধ্যে কেউ উদ্যোক্তা, কেউ চিকিত্সক বা প্রকৌশলী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নির্বাহী এবং উচ্চ পদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণায় বলছে, অর্থনীতিতে নারীর যে অবদান গণনায় আসে না, তার পরিমাণ জিডিপির ৭৭ থেকে ৮৭ শতাংশ। 

বিবিএসের তথ্য মতে, গত ১০ বছর কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে ২ শতাংশ। চিংড়ি, চামড়া, হস্তশিল্পজাত দ্রব্য, চা ও তামাক শিল্পসহ অন্যান্য পণ্যের মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ শতাংশ অর্জনের মূল চালিকাশক্তিই নারী। পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৪০ লাখ কর্মীর মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। বাংলাদেশের পুরুষের পাশাপাশি বৈশ্বিক  শ্রমবাজারে নারীরাও কাজ করছে। এক পরিসংখ্যানে  জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি নারী কর্মরত আছেন। সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলেও ধীরে ধীরে এ খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ২২ হাজারেরও বেশি নারী ব্যাংক খাতে চাকরি করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে ব্যাংক খাতে ১২ শতাংশ নারী কাজ করেন। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংক খাতে কর্মচারী ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৭ জন, এর মধ্যে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্থাত্ ২২ হাজার ৫৩ জন নারী। এদিকে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও নারীর অংশগ্রহণ কর্মীদের মতোই। তবে এ ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে নারী পরিচালকের হার একটু বেশি ১৮ শতাংশ আর বেসরকারি ব্যাংকে পরিচালকদের মধ্যে ১৩ শতাংশ নারী।