মেধাবী মীরের গল্প

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২০, ১৯:৩৩

>> মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

পরীক্ষার কথা শুনলে যেখানে অনেকের জ্বর এসে যায়, ঘুম হয় না, সেখানে ছেলেটির কাছে পরীক্ষা যেন ডাল-ভাত। পরীক্ষা দিলেই সে প্রথম হয়। যেন প্রথম স্থানটি তার জন্যই রাখা হয়েছে। অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবুও সত্যি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির সব পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন তিনি। স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ রেজাল্টের জন্য জুটেছে তার চ্যান্সেলর এবং প্রধানমন্ত্রী পদক। বিদেশি জার্নালে তার অসংখ্য গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। দেশে-বিদেশে বৃত্তি এবং পুরষ্কার পেয়েছেন একাধিক। শিক্ষাক্ষেত্রে সফল এই মানুষটির নাম মীর মোহাম্মদ আলী। বাড়ি খুলনার খানজাহান আলী থানার যোগীপোল গ্রামে। মীরের বাবা মীর তৈয়ব জং। তিনি জুট মিলের মান-নিয়ন্ত্রণ অফিসার। তিন ভাই বোনের মধ্যে মীর বড়। বর্তমানে মীর মোহাম্মদ আলী শিক্ষকতা করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদে।

ছোটবেলা থেকেই মীর বেশ গোছানো। যে কাজ যতটুকু করেন, সেটা সুন্দর পরিকল্পনা মাফিক করার চেষ্টা করেন। পড়াশোনায় এত ভালো করার সিক্রেটটা কী? জানতে চাইলে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পড়াশুনার যতটুকু সময় দিতে হবে সেটা অবশ্যই নিয়মিত দিতে হবে। এই সময়ে সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। নিজেকে অফলাইনে রেখে পড়াশুনা করতে হবে।’

ছোটবেলা থেকেই মীর মেধাবী। পড়াশোনায় ভালো করার জন্য মীর নিজেকে গড়ে তুলেছেন সেই শৈশবে। প্রথম শ্রেণি থেকেই স্কুল-কলেজে প্রথম স্থানটা ছিল তার দখলে। এরপর ভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। সেখানেও ভালো করলেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কৃতিত্বের জন্য স্নাতক পর্যায়ের চারটি লেভেলে ডিন মেরিট লিস্ট অ্যাওয়ার্ড, ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশন বৃত্তি, ন্যাশনাল সাইনন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফেলোশিপ লাভ করেন তিনি। খুলনা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পান। এরপর ভর্তি হন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টারগুলোতে সবার চেয়ে ভালো ফলাফল করতে থাকেন তিনি। ২০১৩ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) মাত্স্য বিজ্ঞান অনুষদ থেকে সর্বোচ্চ সিজিপিএ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একইভাবে সর্বোচ্চ সিজিপিএ নিয়ে ২০১৫ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরই কৃতিত্বস্বরূপ তিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক অর্থাত্ চ্যান্সেলর পদক লাভ করেন। এছাড়াও ২০১৭ সালের ২২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ রেজাল্টের জন্য তিনি পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৩।

দিনের ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পড়াশোনা খুব কার্যকর বলে মনে করেন মীর। যত যাই কাজ থাক, এই সময়টা মীর পড়াশোনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। নিজের এই অভ্যাস প্রসঙ্গে মীর বলেন, ‘সকালে উঠার অভ্যাসটি আমাকে এনে দিয়েছে সফলতা। কারণ এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ঘুমিয়ে থাকে। জীবনে সফলতার জন্য ভালো একটি পরিকল্পনা এবং সর্বাত্মক চেষ্টা থাকা চাই।’ এই দুটি জিনিস সবচেয়ে বেশি দরকার বলে মীর মোহাম্মদ মনে করেন। তার মতে, একটি সুন্দর পরিকল্পনা ও সংকল্পই এনে দিতে পারে জীবনের সফলতা। আর অবশ্যই সঙ্গে মা-বাবার দোয়া থাকতে হবে। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসাবে মীর বলেন, ‘আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পারেন একটি ছেলেকে আদর্শের বিষয়ে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিতে।’

মীর মোহাম্মদ গবেষণা করতে পছন্দ করেন। তিনি সরকারি, বেসরকারি এবং দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থা ও শিক্ষকদের সঙ্গে কখনো এককভাবে আবার কখনো যৌথভাবে একাধিক গবেষণা করেছেন। তিনি কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিস ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও। বাল্যবিবাহ রোধ, উপকূলীয় দরিদ্র জেলে-সম্প্রদায় ও অসহায় দুস্থদের পাশে দাঁড়াতে চান মীর।