বিদেশি নাগরিকদের কর ফাঁকি তদারকি কার্যক্রমে ভাটা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:১৬

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কর ফাঁকির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও তা রোধ করতে এখন পর্যন্ত টেকসই কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত দুই/তিন বছর আগে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কর ফাঁকি রোধে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতায় তাতে ভাটা পড়েছে। ফলে এত বছরেও বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বিশ্বাসযোগ্যভাবে চিহ্নিত করা, বৈধ-অবৈধ কর্মরত বিদেশি নাগরিক নির্ধারণ, তাদের প্রকৃত আয়, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকৃত আয়কর আদায় করাও সম্ভব হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি এনবিআর বাংলাদেশে আগত বিদেশি কর্মীদের আয়কর বিষয়ে সচেতন করতে লিফলেট বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর ছাড়াও বিদেশি অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে আয়কর বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে এ লিফলেট বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশিদের কর ফাঁকি রোধে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা চিহ্নিত করা ও তাদের কাছ থেকে প্রযোজ্য কর আদায় করতে প্রায় তিন বছর আগে এনবিআর একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে। ওই টাস্কফোর্স বিদেশি কর ফাঁকিবাজ বিদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করতে বেশকিছু কার্যক্রমও শুরু করে। এ লক্ষ্যে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, গোয়েন্দা বিভাগ, পুলিশ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিদেশি নাগরিক কাজ করে, এমন ২৮৬টি প্রতিষ্ঠানকেও চিহ্নিত করে এনবিআর। এছাড়া তাদের কর ফাঁকি ধরতে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বিমানবন্দর ত্যাগকালে আয়কর সনদ দেখানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে কর বিভাগ। এ লক্ষ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ চারটি বন্দরে ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত ডেস্ক চালু করার পর বেশ কয়েকজন কর ফাঁকিবাজ বিদেশি নাগরিককে চিহ্নিতও করা হয়। শুধু তা-ই নয়, তাদের কাছ থেকে এ প্রক্রিয়ায় কয়েক কোটি টাকা আয়করও আদায় করা হয়।

তবে এসব কার্যক্রমের মধ্যেই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা ও এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের আসার প্রবণতা কিছুটা কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে দেশে অবস্থিত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে আয়কর ইস্যুতে নতুন করে ভীতি ছড়ানো ঠেকাতে কিছুটা সতর্ক অবস্থানে আসে এনবিআর। ফলে ধীরে ধীরে ওয়ার্ক পারমিটবিহীন বিদেশি নাগরিক চিহ্নিত করার কার্যক্রম গতি হারায়।

এনবিআরের হিসাবে, বর্তমানে দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (ই-টিআইএন) বিদেশি করদাতার সংখ্যা ১২ হাজার ৪২১ জন। অন্যদিকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ওয়ার্ক পারমিট গ্রহণকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা সাত হাজারের সামান্য বেশি। অথচ দেশে কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষত গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা, বায়িং হাউজ, এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানি, তথ্য-প্রযুক্তি কোম্পানি, অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কয়েক লাখ বিদেশি কাজ করেন। অথচ তাদের প্রকৃত সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। তাদের বেতনের প্রকৃত অংকও গোপন করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ধারণা করা হয় বিদেশি কর্মীদের বেশিরভাগই প্রতিবেশী ভারতের। এর বাইরে শ্রীলঙ্কা, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, পাকিস্তান ছাড়াও আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার নাগরিকরা বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে কাজ করেন।

বর্তমানে দেশে কোন বিদেশি নাগরিক ৩ মাস অবস্থান করলে তার কর ফাইল খুলতে হয়। এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অনেক বিদেশি নাগরিক কর ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে তিন মাসের ঠিক আগে বাংলাদেশ ত্যাগ করে আবার ফেরত আসেন। অনেকে বছরের পর বছর পার করলেও এ প্রক্রিয়ায় কর এড়িয়ে যাচ্ছেন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বড় ক্রিকেট উত্সব বিপিএলেও অনেক বিদেশি খেলোয়াড়ের কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, গত মাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় ইস্যুটি আলোচনায় আসে। ওই সভায় বলা হয়, দেশে বিপুল সংখ্যক বিদেশি কর্মী বেআইনিভাবে এদেশে চাকরি করছেন। কিন্তু এনবিআরের কাছে টিআইএনধারী সাড়ে ১২ হাজারেরও কম। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে প্রবেশকালে বিমানবন্দর স্থলবন্দরে লিফলেটের মাধ্যমে ধারণা প্রদান করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।