সড়কে প্রাণ ও শৃঙ্খলাবোধের অভাব

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২০, ২১:২৮

আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে একটি প্রচলিত কথা আছে—দয়ালু ঈশ্বর কেন মানুষকে সড়ক দুর্ঘটনায় ফেলেন! কারণ মানুষ সড়কে নামিবে এবং সতর্ক হইবে না, তাই। অর্থাত্ সড়ক চলাচলে সতর্ক করিবার জন্যই ঈশ্বর অসতর্ক কাহারো জীবন লইয়া উদাহরণ সৃষ্টি করেন; কিন্তু এই উদাহরণও আমাদের দেশের এই রাস্তায় চলাচলকারীদের সতর্ক করিতে পারে না। নিত্যদিন সড়কে ঝরিতেছে মূল্যবান প্রাণ। কোথাও যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে, কোথাও চলন্ত গাড়ি হইতে রাস্তায় ছিটকাইয়া পড়িয়া, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিভাইডারের উপরে উঠিয়া বা গাছের সহিত ধাক্কা লাগিয়া প্রাণহানি ঘটিতেছে। এমনও দেখা যায়, চলন্ত গাড়ির সম্মুখ দিয়া বিনা কারণে দ্রুত পার হইতে গিয়া অথবা সড়কের পাশ দিয়া যাইবার সময় মৃত্যুবরণ করিতেছে। ইহার প্রত্যেকটির পিছনেই আছে হয় চালক অথবা পথচারীর অসতর্কতা। সোমবার যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানাইয়াছে—শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই সড়কে প্রাণ দিয়াছে ৫৩৪ জন। ইহার মধ্যে পথচারী ১৮৭ জন। ১৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই দেশব্যাপী ২৫টি দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে যাহাতে ২৭ জনের প্রাণহানি ঘটিয়াছে। অন্য একটি সহযোগী পত্রিকা জানাইয়াছে, শেষ ৩০৭ দিনে সড়কে প্রাণ হারাইয়াছে ২ হাজার ৬২৯ জন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের সড়কে প্রাণ যাওয়া কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নহে। উল্লেখ্য, নূতন এক আপদ সৃষ্টি হইয়াছে মোটরবাইক। দেশে এখন লক্ষ লক্ষ মোটরবাইক চলিতেছে। উহাদের বড়ো একটি অংশের কোনো প্রশিক্ষণ নাই, এমনকি বৈধ লাইসেন্স বা কাগজপত্র নাই।

দেশে নূতন নূতন সড়ক তৈরি হইতেছে, দেশব্যাপী সড়ক সম্প্রসারিত হইতেছে। পাশাপাশি বাড়িতেছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার। নিঃসন্দেহে ইহার প্রধান কারণ—সড়কে শৃঙ্খলা না থাকা। ইহা খুবই দুঃখজনক যে, এত মানুষের এই দেশে শৃঙ্খলাবদ্ধ নহে কেহই। না গাড়ির চালক, না রাস্তায় চলাচলকারী পথচারী। কেহ কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করে বলিয়া মনে হয় না। গাড়ির চালকেরা বেপরোয়া আজ নূতন নহে। কথায় বলে, দুর্ঘটনা বলিয়া-কহিয়া আসে না; কিন্তু বেপরোয়া আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি যে অনেকাংশে লাঘব হইবে তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। এই সকল চালক সড়কে যানবাহন চলাচলের চিহ্নগুলি ভ্রুক্ষেপ করে না। আবার পথচারীরাও জেব্রা ক্রসিং দিয়া সিগন্যাল মানিয়া পার হওয়া, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করার ব্যাপারে অসচেতন। অবশ্য ইহাও ঠিক যে, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও রহিয়াছে দুর্বলতা। যেমন গ্রাম-গঞ্জ দিয়া যেই সকল রাস্তা চলিয়া গিয়াছে সেইগুলিতে সড়কে ব্যবহূত চিহ্ন নাই। অনেক ক্ষেত্রেই নাই প্রয়োজনীয় ডিভাইডার অথবা স্পিডব্রেকার। পুনরায় বলিতে হয়, থাকিলেও কেহ মানে না। 

এই পরিস্থিতিতে  সর্বদা আইন প্রয়োগ করাও সম্ভব নহে। তাহা হইলে উপায় কী আমাদের? একমাত্র উপায় মানুষের মধ্যে দায়িত্বজ্ঞানবোধ সৃষ্টি। আর এই দায়িত্বজ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হইতেছে সমাজের সর্বক্ষেত্রে। তাই সরকারের পক্ষ হইতে দায়িত্বজ্ঞান বৃদ্ধির ব্যাপারে শক্ত হইতে হইবে। আর এই শক্ত হওয়া মানে আইনের যথাযথ প্রয়োগ। কোটি কোটি মানুষের একটি দেশ, কেন প্রায় সমস্ত মানুষ শৃঙ্খলাহীন জীবনে অভ্যস্ত হইবে, কেন দায়িত্বসচেতন হইবে না! এইভাবে চলিতে থাকিলে কেবল সড়কে প্রাণ নহে, জাতীয় জীবনটাই আমাদের হুমকির ঝুঁকিতে পড়িবে।