চারুবালা করের নামে একটি সড়কের নামকরণ হোক

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২০, ২১:৩১

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ যশোরবাসীর কাছে ঐতিহাসিক দিন। পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর নির্বিচার গুলি বর্ষণে এই দিনে যশোরে প্রথম শহিদ হয়েছিলেন চারুবালা কর। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করলে যশোরের মানুষও ফুঁসে ওঠে। রাজপথে নেমে আসে প্রতিবাদী মানুষ, মিছিলে-স্লে­াগানে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। ২ মার্চ রাতের আঁধারে পাকবাহিনী যশোর সার্কিট হাউজ, টেলিফোন ভবনসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অবস্থান নেয়। ৩ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টা। স্বতস্ফূর্ত জনতার এক বিশাল মিছিল বের হয় ঈদগাহ ময়দান থেকে। দড়াটানা মোড় ঘুরে কাপুড়িয়াপট্টি-চৌরাস্তা হয়ে মিছিলটি প্রবেশ করে রেলরোডে। মিছিলটি সরকারি খাদ্য গুদামের সামনে পৌঁছুলে সেখানে পাকবাহিনীর সদস্যদের অবস্থান করতে দেখে তাদের দিকে ইট ও জুতা নিক্ষেপ করতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। ঐ সময় এক পাকসেনা বিক্ষুব্ধ জনতাকে ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ফাঁকা গুলি ছোড়ে, গুলিবিদ্ধ হয় আকাশে ভেসে বেড়ানো একটি চিল। মৃত চিলটিকে নিয়ে মিছিলটি ঢোকে ভোলা ট্যাংক সড়কে। সার্কিট হাউজের সামনে পৌঁছে ভিতরে পাকসেনাদের দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জনতা। শহরের বিভিন্ন মহল­া থেকে বিক্ষুব্ধ মানুষ তখনও জড়ো হচ্ছিলের সেখানে। দুপুর ১২টার দিকে হানাদারবাহিনীর একটি গাড়ি ঈদগাহর পাশের রাস্তা অতিক্রম করার সময় জনতা আবারও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। জনতার দিকে অস্ত্র তাক করে হানাদাররা। ঐ সময় হঠাত্ খবর আসে টেলিফোন ভবন দখল করে নিয়েছে হানাদারবাহিনী। চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত ছাত্র-জনতার মধ্যে, উত্তেজিত ছাত্র-জনতার একটি অংশ ঈদগাহ ময়দান থেকে বেরিয়ে টেলিফোন ভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এ সময় টেলিফোন ভবনের ছাদ থেকে জনতার উদ্দেশ্যে মেশিনগান দিয়ে গুলি বর্ষণ করতে শুরু করে পাকবাহিনী।

টেলিফোন ভবনের পশ্চিম পাশে (বর্তমান হোটেল হাসান ইন্টারন্যাশনাল) বসবাস করতেন নিঃসন্তান পূর্ণ চন্দ্র কর ও তার স্ত্রী চারুবালা কর। হানাদারবাহিনীর ছোড়া একটি বুলেট ঘরের গোলপাতার ছাউনি ভেদ করে বিদ্ধ হয় চারুবালা করের মাথায়। শহিদ হন তিনি। চারুবালা করের মরদেহ নিয়ে রাখা হয় তত্কালীন যশোর সদর হাসপাতাল মর্গে। মর্গে তালা লাগিয়ে পাকসেনারা অবস্থান নেয় সেখানে। বাইরে হাজার হাজার মানুষ চারুবালা করের মরদেহ নেওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু পাকসেনারা মরদেহ দিতে নারাজ। অপেক্ষমাণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করে। ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠতে থাকে অপেক্ষমাণ মানুষ। মুহূর্তে জনতা মর্গের তালা ভেঙে বাইরে নিয়ে আসে চারুবালা করের মরদেহ, সূর্য তখন প্রায় অস্তগামী। সত্কারের জন্য শহিদ চারুবালা করের মরদেহ নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটছে নীলগঞ্জ শ্মশানের দিকে।

শহিদ চারুবালার স্মৃতি ধরে রাখতে টেলিফোন ভবনের সামনের সড়কটির নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ সড়ক’ রাখা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে। শহিদ চারুবালা করের স্মৃতিস্তম্ভ বেদখল হয়ে গেছে। ভেঙে গেছে স্তম্ভের কিছু অংশ। স্মৃতিস্তম্ভে লেখা চারুবালার নামটিও তুলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, শ্মশান কমিটিসহ যশোরের সচেতন নাগরিকরা শহিদ চারুবালার স্মৃতিস্তম্ভটি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও দখলমুক্ত হয়নি সেটি। আমরা যশোরবাসী চাই, চারুবালা করের নামে একটি সড়কের নাম করা হোক। অথবা শহীদ সড়কের নাম চারুবালা করের নামে হোক।

সাজেদ রহমান, যশোর