স্পোর্টস রিপোর্টার, সিলেট থেকে
আগের ম্যাচেই আউট হয়ে ফেরার পর এই গ্যালারি থেকে গালি উড়ে এসেছে তার দিকে।
গতকাল হাজার হাতে সেই গ্যালারি থেকেই ভেসে এলো করতালি। কিন্তু তার কোনো হেলদোল নেই। ৭ হাজার রান স্পর্শ করে নির্বিকার রইলেন, সেঞ্চুরি করেও তেমন কোনো উদ্যাপন নেই; এমনকি নিজের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটা ভেঙে ফেলার পরও একেবারে চুপচাপ। তিনি যেন ঠিক করেই রেখেছিলেন, তিনি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না।
তাতে কী!
নিজে একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে রইলেও তার হয়ে কথা বলার দায়িত্বটা নিল তার ব্যাট। মঙ্গলবারের বিকালবেলায় সিলেট স্টেডিয়ামে সরব হয়ে উঠল তামিম ইকবালের ব্যাট। একটার পর একটা কীর্তি করে যেন তামিমের হয়ে সব কথার উত্তর দিল সেই ব্যাট।
ইনিংস বিরতিতে কথা বলতে এসে প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বললেন, এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস, ‘অসাধারণ ইনিংস। বাংলাদেশের সেরা। মাঝে কিছুদিন ওর ব্যাটে একটা গ্যাপ ছিল। কিন্তু ও ক্লাস খেলোয়াড়। নিজেকে ফিরে পেয়েছে। পরপর দুই ম্যাচে দুই ওপেনার সেঞ্চুরি করল। এটা আমাদের জন্য স্বস্তির।’
এটা সবচেয়ে বড়ো স্বস্তির তামিম ইকবালের জন্য। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন। তারপর কেটে গেছে ২৩ ম্যাচ। সময়ের হিসাবে প্রায় ১৮ মাস। এ সময়ের মধ্যে আর সেঞ্চুরি পাননি। সবচেয়ে বড়ো কথা ব্যাটিং এপ্রোচের কারণ তার দলে জায়গা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল।
ক্যারিয়ারের কখনোই খুব বেশি সিঙ্গেল বের করার প্রবণতা ছিল না তামিমের। কিন্তু বাউন্ডারি দিয়ে পুষিয়ে দিতেন স্ট্রাইক রেট। সম্প্রতি পাওয়ার প্লেতে সেই তামিমই হয়ে গিয়েছিলেন নীরব। বাউন্ডারির চেষ্টাটাই যেন কমিয়ে দিয়েছিলেন। মনোভাবটাই পরিষ্কার ছিল না।
ম্যাচের আগের দিনও ব্যাটিং কোচ নীল ম্যাকেঞ্জিকে এক গাদা প্রশ্ন শুনতে হলো এই তামিম ইকবালকে নিয়ে। ম্যাকেঞ্জি বারবারই বলার চেষ্টা করলেন, তামিমের স্বরূপে ফেরাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি একটা পথ বাতলেও দিয়েছিলেন—শুরুতে গোটা দুই বাউন্ডারি পেয়ে গেলেই এ জড়তাটা কেটে যাবে বলে আশা করছিলেন। তাই হলো।
গতকাল প্রথম পাওয়ার প্লেতে ১০টা বাউন্ডারি মারলেন তামিম। আর তাতেই বোঝা গেল এ দিনটা তামিমের। আস্তে আস্তে সময় গড়াল, আরো বেশি চড়াও হলেন বোলারদের ওপর। মুশফিক ৫৫ ও মাহমুদউল্লাহ ৪১ রান করে দারুণ সমর্থন দিলেন। এগোনোর পথে তিরিপানোকে চার মেরে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ৭ হাজার রান পার করলেন। এর আগে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ৫ ও ৬ হাজার রানও করেছিলেন তিনি।
শন উইলিয়ামসের বলে দুটো রান নিয়ে নিজের ১২তম ওয়ানডে সেঞ্চুরিটা করে ফেললেন। এরপর আরো রুদ্রমূর্তির হয়ে উঠলেন। সেঞ্চুরি পার করার পর মুতুম্বোজির ৪০তম ওভারের প্রথম ৪ বল থেকে ১৮ রান তুলে নিলেন—৩টি চার ও একটি ছক্কা। মুম্বাকে ছক্কা মেরে পার করলেন নিজের রেকর্ড।
১৫০ রানে দাঁড়িয়ে মারলেন ঐ ছক্কা। এর আগে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৫৪ রানের ইনিংস তামিম ইকবালেরই ছিল; ২০০৯ সালে এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেছিলেন। সেটাকে ছাপিয়ে গেলেন ছক্কা মেরে। দুই বল পর ফিরে এলেন। আস্তে আস্তে হেঁটে প্যাভিলিয়নে ঢুকলেন। মনে হলো পেছনে ফেলে এসেছেন দুঃসময়ের এক ইতিহাস।
বাংলাদেশের
পক্ষে
সর্বোচ্চ
রান ব্যাটসম্যান প্রতিপক্ষ সাল
১৫৮ তামিম ইকবাল জিম্বাবুয়ে ২০২০
১৫৪ তামিম ইকবাল জিম্বাবুয়ে ২০০৯
১৪৪ মুশফিকুর রহিম শ্রীলঙ্কা ২০১৮
১৪৪ ইমরুল কায়েস জিম্বাবুয়ে ২০১৮
১৩৪* সাকিব আল হাসান কানাডা ২০০৭
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে
দ্বিতীয় ওয়ানডে
টস :বাংলাদেশ
বাংলাদেশ :৫০ ওভারে ৩২২/৮ (তামিম ১৫৮, মুশফিক ৫৫, মাহমুদউল্লাহ ৪১, মিঠুন ৩২*; মুম্বা ২/৬৪, তিরিপানো ২/৫৫)
জিম্বাবুয়ে: ৫০ ওভারে ৩১৮/৮ (রাজা ৬৬, মাধেভেরে ৫২, তিরিপানো ৫৫*, তিনাশে ৫১, মুতোমবোজি ৩৪, মুতুম্বামি ১৯; তাইজুল ৩/৫২, মিরাজ ১/২৫, মাশরাফি ১/৫২)
ফলাফল: বাংলাদেশ ৪ রানে জয়ী।
সিরিজ :তিন ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে জয়ী। ম্যাচ সেরা: তামিম ইকবাল (বাংলাদেশ)।
