নেয়ামত উল্লাহ
একটা সময় ছিল আবাহনী-মোহামেডানের ফুটবল ম্যাচ থাকলে দেশে আর কোনো কাজ থাকত না। সকাল থেকে ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরো দেশ মাতোয়ারা থাকত দেশসেরা ক্লাব দুটির দ্বৈরথ নিয়ে। কাজী সালাহউদ্দীন-শেখ আসলাম, বাদল রায় কিংবা বছর আটেক আগে অবসর নেওয়া আলফাজ আহমেদদের অবসরের সঙ্গে সঙ্গে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথও হয়েছে বিগত যৌবনা। কিন্তু কেন?
দেশের ক্লাব ফুটবলে মোহামেডানের অস্তিত্ব ছিল স্বাধীনতার আগ থেকেই। সেখানে আবাহনীর পথচলার শুরু ১৯৭২ সালে, বঙ্গবন্ধু-তনয় শেখ কামালের হাত ধরে। জন্মের বছর চারেকের মধ্যেই দেশের ফুটবলে শীর্ষ ক্লাব বনে যাওয়ায় আবাহনীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা শুরু হয় মোহামেডানের সঙ্গে।
কাজী সালাহউদ্দীন-পাকির আলিদের হাত ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা চূড়ান্ত রূপ পায় পরের দশকে। এতোটাই যে, ১৯৮৫ ঢাকা লিগে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচটা দর্শকবৈরিতার কবলেও পড়ে। সেসব পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিতেই স্মৃতিকাতরতা পেয়ে বসে সাবেক আবাহনী তারকা শেখ আসলামকে, ‘তখনকার আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানেই ছিল বাড়তি রোমাঞ্চ, উত্তেজনা। দর্শকদের চাপ, পারিপার্শ্বিকতা মিলিয়ে এ লড়াইটা খুব গুরুত্ববহ ছিল। সেরকমই এক সময় ১৯৮৪ সালে প্রথম আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচটা খেলি আমি।’
নিজের আবাহনী-মোহামেডান অভিষেককে এযাবতকালের সেরা বলেও আখ্যা দেন সাবেক আবাহনী ফরোয়ার্ড, ‘সালাহউদ্দীন ভাইয়ের পাশে জায়গা করে নেওয়ার চাপ ছিল। তবে সবকিছু একপাশে রেখে সেদিন দুটো গোল করেছিলাম আমি। পরে মোহামেডান ম্যাচে সমতা ফিরিয়েছিল। শেষে পাকির আলির গোলে আমরা জিতি। ম্যাচটাকে তো আমি সেরা আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচই বলব।’
সাবেক মোহামেডান ফরোয়ার্ড আলফাজ আহমেদের প্রথম আবাহনী-মোহামেডান স্মৃতিটাও মধুর। ফেডারেশন কাপের গ্রুপ পর্বে ১৯৯৫ সালে আবাহনীর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই যে গোল পেয়েছিলেন। বর্তমানে উত্তর বারিধারার প্রধান কোচ হিসেবে থাকা আলফাজ ইত্তেফাককে জানান, ম্যাচের গুরুত্বটা বুঝেছিলেন পরদিন খবরের কাগজ পড়ে!
আলফাজের ভাষ্য, ‘সে ম্যাচে আমার একমাত্র গোলেই আমরা আবাহনীকে হারিয়েছিলাম। তখনো ম্যাচের বিশালতা বুঝিনি। বুঝলাম পরদিন সব জাতীয় দৈনিকে নিজের ছবি দেখে। আমার বিশ্বাস, সে গোলটাই আমাকে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছিল।’
তবে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথের ঝাঁজ—তীব্রতা কিংবা রোমাঞ্চ, সবই এখন অতীত। আসলাম জানালেন, তিনি জানতেনই না আজ বুধবার মৌসুমের প্রথম লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী! এমন উত্তাপহীনতার কারণ হিসেবে সাবেক মোহামেডান সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল দেখলেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাবকেই।
সাবেক মোহামেডান সংগঠকের কথা, ‘এখানে মূল কারণটা হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব। দর্শক ফলাফল চায়, যেটা না পেলে মুখ ফিরিয়ে নেবেই।’ শেষ ক’বছরে মোহামেডানও দল গড়েছে লিগে টিকে থাকার জন্যে, অন্যদিকে আবাহনী এগিয়ে গেছে যোজন যোজন দূরে। দুই দলের দ্বৈরথের উত্তাপটা ফেরাতে হলে মোহামেডানকেই এগিয়ে আসতে হবে, অভিমত সাবেক মোহামেডান কর্মকর্তা হেলাল ও ফরোয়ার্ড আলফাজের।
তবে শেখ আসলামের মতে, পাইপলাইনের দুর্বলতাও এখানে কাজ করছে বড়ো নিয়ামক হিসেবে। তিনি বলেন, ‘দায়সারা গোছের আয়োজনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের মান নেমে গেছে। পাইপলাইন হয়ে গেছে দুর্বল। এ কারণে এখন আর অতীতের মতো তারকা উঠে আসছে না। দর্শকও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।’
হারানো জৌলুস ফেরাতে সবল করতে হবে তৃণমূল, এগিয়ে আসতে হবে মোহামেডানকেও। তবেই পুরোনো রূপে ফিরবে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ, উপকৃত হবে দেশের ফুটবল। অন্যথায় এ দুয়ে অন্ধকারই ভবিতব্য।
