অফিস নেই, ঠিকানা নেই, দু-একটি ছাড়া অন্য দলগুলোর নাম ও নেতাদেরও কেউ চিনত না—এ রকম প্যাডসর্বস্ব ৫৮টি দল নিয়ে ঢাউস জোট ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ সংক্ষেপে ‘ইউএনএ’ গঠন করে রাজনীতিতে অন্যরকম আলোচনার খোরাক যুগিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। এখন এরশাদ নেই, তার গড়া সেই ‘ইউএনএ’ও মরে গেছে। আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকটা রাগের বশে গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট। কিন্তু একে একে শরিকদের বেশির ভাগই নীরবে বি. চৌধুরীকে ছেড়ে চলে গেছে। আর বিএনপি, ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওপর অনুচ্চারিত ক্ষোভ থেকে গত বছরের জুনে হুট করে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে পৃথক মঞ্চ বানান লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ (অব.)। এই মঞ্চ গঠনের পর থেকেই অলি কার্যত বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল থেকে বিচ্ছিন্ন।
২০১৭ সালের ৭ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দুটি দল ও দুটি পৃথক জোটের সমন্বয়ে ইউএনএ’র ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদ, যাতে নিবন্ধিত দল ছিল মাত্র দুটি—জাপা ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। এর বাইরে থাকা দুটি জোট ছিল—‘জাতীয় ইসলামী মহাজোট’ ও ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)’। এই দুটি জোটে দল ছিল ৫৬টির মতো, এর সবগুলোই অনিবন্ধিত। এরশাদ ছিলেন এই জোটের চেয়ারম্যান।
ইউএনএ গঠনের পর থেকেই এর তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না রাজনীতির ময়দানে। জীবিত থাকতে এরশাদ নিজেও কিংবা দলগতভাবে জাপা জোটসঙ্গীদের নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। জোট গঠনের নয় দিনের মাথায় জোট থেকে নয়টি দল বের হয়ে যায়। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের দুই-তিন জন শরিক নেতাকে জাপা দলীয়ভাবে মনোনয়ন দিলেও তাদের আসনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা ছিল না। ফলে জাপার বাইরে ইউএনএ-এর কেউ নির্বাচিতও হতে পারেননি। যার কারণে নির্বাচনের পর জাপা থেকে জোটের শরিকরা সবাই নিজেদের গুটিয়ে নেয়। আর গত বছরের ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার নেতৃত্বে গঠিত জোট ‘ইউএনএ’ও কর্পূরের মতো উধাও হয়ে গেছে। জাপার বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাও পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, জাপার কোনো জোট নেই।
ইউএনএ’র সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় গতকাল সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইউএনএ ছিল শুধু নির্বাচনী জোট। নির্বাচন শেষে এই জোটের আর কোনো কার্যকারিতাও নেই। জোটের চুক্তিতেও নির্বাচনকেন্দ্রিক জোটের কথা উল্লেখ ছিল।’ তবে ইউএনও’র ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সুনীল শুভ রায়ের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায় না। জাপার পক্ষে এরশাদ, ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মান্নান, জাতীয় ইসলামী মহাজোটের চেয়ারম্যান আবু নাছের ওয়াহেদ ও বিএনএ’র চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী মনি জোটের সেই ঘোষণাপত্রে সই করেছিলেন। ওই ঘোষণাপত্রে বলা ছিল, ‘এই জোট নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেবে। ফল যা-ই হোক না কেন, জোট বহাল থাকবে। জোটের স্থায়িত্বের জন্য রাজনৈতিক বিপদে-আপদে, সুদিনে-দুর্দিনে শরিকরা একে অপরের পাশে থাকবে। স্বার্থের কারণে কোনো দল জোট ছেড়ে যাবে না—এই অঙ্গীকার থাকবে।’
বি. চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট থেকে নীরবেই সরে গেছে শরিকরা
একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নিয়ে বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বি. চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপির কাছে বিকল্পধারা ১৫০ আসন চাইলে এবং জামায়াতকে ত্যাগ করার শর্ত দিলে শেষ পর্যন্ত বি. চৌধুরীকে বাদ দিয়েই ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। কয়েক দিনের মাথায় বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে ১১টি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। তবে নির্বাচনের ছয় মাস পর, অর্থাত্ গত বছরের জুন থেকেই অকার্যকর হয়ে পড়ে বি. চৌধুরীর এই জোট। বিকল্পধারার সঙ্গে সম্পর্কছেদ করে একে একে সরে যায় বেশির ভাগ শরিক। এসব শরিক বর্তমানে যে যার মতো এককভাবে নিজেদের সংগঠন নিয়ে পথ চলার চেষ্টা করছে।
প্রসঙ্গত, যুক্তফ্রন্টের শরিকরা হলো—বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বিএলডিপি, বাংলাদেশ ন্যাপ, এনডিপি, জাতীয় জনতা পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মতিন), বাংলাদেশ গণসাংস্কৃতিক দল, বাংলাদেশ জনতা লীগ, বাংলাদেশ শরীয়া আন্দোলন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি (মেহেদী), বাংলাদেশ মাইনোরিটি ইউনাইটেড ফ্রন্ট। দলগুলোর মধ্যে বিকল্পধারা, ন্যাপ ও গণফ্রন্ট নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত।
যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেন বি. চৌধুরী। দরকষাকষি শেষে আওয়ামী লীগ শুধু তিনটি আসনে ছাড় দেয় যুক্তফ্রন্টকে। শেষ পর্যন্ত ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বি. চৌধুরীর ছেলে মাহী বি. চৌধুরী ও বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। এতে জোটের অন্য শরিকরা ক্ষুব্ধ হন। তবে নির্বাচন পরবর্তী সুযোগ-সুবিধার আশায় চুপ থাকেন শরিক দলের নেতারা। তবে ছয় মাসে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না মেলায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় শরিকরা। যুক্তফ্রন্টের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূইয়া গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা এখন আর যুক্তফ্রন্টে নেই। জুন থেকেই জোট অকার্যকর হয়ে গেছে।’ তবে যুক্তফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়কারী ও বিকল্পধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম সারোয়ার মিলন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘জোট এখনো আছে, তবে কার্যক্রম নেই। শরিকদের কেউ কেউ বলছে থাকবে না, এই আর কী।’
‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ গঠন করে ২০ দল থেকে বিচ্ছিন্নপ্রায় অলি
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমান্তরালে গতবছরের ২৭ জুন ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে পৃথক মঞ্চের ঘোষণা দেন ২০ দল শরিক এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ। এরপর থেকেই ২০ দলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। যদিও অলির নেতৃত্বাধীন এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ নিয়মিত ২০ দলের বৈঠকে অংশ নেন, তবে জাতীয় মুক্তি মঞ্চ গঠনের পর থেকে বিএনপির সঙ্গে অলি আহমদ যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন।
অলি আহমদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে একেবারে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন, এটা ঠিক না। তবে নির্বাচনের পর থেকে ২০ দলের কোনো বৈঠকে আমি যাইনি, এটা ঠিক।’
‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ ঘোষণার দিন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ১৮টি দফা তুলে ধরেন অলি আহমদ। পৃথক মঞ্চ ঘোষণা উপলক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে অলি আহমদের পাশে বসেছিলেন ২০ দল শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, জাগপার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে তাসমিয়া প্রধান, খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা আহমদ আলি কাসেমী ও ইসলামী সংগীত শিল্পী মুহিব খান।
পৃথক মঞ্চ গঠন করে শুধু বিএনপি বা ২০ দল থেকেই অলি আহমদ নিজে বিচ্ছিন্ন হননি, তার দল এলডিপিও ভেঙে দুই টুকরা হয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি এলডিপির একাংশের জাতীয় কাউন্সিলে অলিকে বাদ দিয়ে পৃথক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিলে আবদুল করিম আব্বাসী সভাপতি ও শাহাদাত হোসেন সেলিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আব্বাসী-সেলিমের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ২০ দলের শরিক হিসেবে সক্রিয়।
