সেবার মান না বাড়িয়ে পানি ও পয়োনিষ্কাশনের বাড়তি দাম

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২০, ০৯:২৪

সেবার মান না বাড়িয়ে পানির ২৫ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা)। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে এই দাম। শুধু পানি নয়, পানির সঙ্গে যাদের পয়োনিষ্কাশন লাইন রয়েছে তাদেরও গুনতে হবে সমপরিমাণ বাড়তি বিল। বিদ্যুত্ বিল বাড়ার পরেই এমন বাড়তি পানি ও পয়োনিষ্কাশন বিলের দাম বাড়ানো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। পানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হলেও পয়োনিষ্কাশন বিলের ব্যাপারে আলাদা করে স্পষ্ট করেনি ওয়াসা।

জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার ১১টি মড্স জোনের মধ্যে পাঁচটি জোনে পয়োনিষ্কাশন সংযোগ আছে। এর মধ্যে আছে নবাবপুর, বাসাবো, গেন্ডারিয়া, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, হাজারীবাগ, আজিমপুর, নবাবগঞ্জ, আগারগাঁও, নীলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, মিরপুরের অংশবিশেষ এবং ধানমন্ডি, তেজগাঁও, গুলশান, বনানী, বাংলামোটর, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকা। এসব এলাকায় পানির বিলের সমপরিমাণ পয়োনিষ্কাশন বিল পরিশোধ করেন গ্রাহকরা। ঢাকা ওয়াসার মোট ৯৩৪ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন লাইনের আওতায় সংযোগ রয়েছে ৮৮ হাজার ৯৮০টি। অন্যদিকে গত প্রায় ১২ বছরে মোট ১৩ বার পানির দাম বেড়েছে।

ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসের মধ্যে দুই দফা পানির দাম বাড়ায় ঢাকা ওয়াসা। এর আগে গত বছরের জুলাইয়েও ৫ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো হয়েছিল। ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর পানির দাম একবার করে বেড়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে দাম বেড়েছিল দুইবার। এ বছর দাম বাড়ানোর কারণে আগামী এপ্রিল থেকে আবাসিকে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম হবে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা। ওয়াসার আইন অনুযায়ী, ওয়াসার বোর্ড প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়াতে পারে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদন নিয়ে এবার পানির দাম ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর আগে পানির দাম ৮০ শতাংশ বাড়াতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয় ওয়াসা। তবে মন্ত্রণালয় আবাসিক গ্রাহক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর বিষয়ে অনুমোদন দেয়। দাম বাড়ানোর বিষয়ে ওয়াসা একটি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে, পানি সরবারহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৯৬ এর ২২ (১) ও ২২ (৩) ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ওয়াসা পানির উত্পাদন ও বিতরণ ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস?্য বিধান এবং বিদ্যুত্ ও গ?্যাসের দাম বাড়ার কারণে ব?্যয় সমন্বয় করতে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত সকল প্রকার পানি ও পয়নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুরাইন, দনিয়া, শ্যামপুর, কদমতলী, গেন্ডারিয়া, যাত্রাবাড়ী, মীরহাজিরবাগ, পল্টনসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ওয়াসার পানি ফুটানো ব্যতীত পান করা সম্ভব নয়। এসব এলাকার মানুষ পানি ফুটিয়ে তারপর খাওয়ার উপযোগী করে। এরপরও এসব এলাকায় পানির মান উন্নয়নে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ওয়াসা।

টিআইবির এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করে। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করে। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকেরা বিভিন্ন সময়ে ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ, ময়লা থাকার অভিযোগ করে আসছে। এদিকে পানির দাম বাড়ানোর কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ নাগরিকরা। সাইফুল আলম নামে একজন বলেন, ওয়াসার পানির মান না ঠিক করে হুট করে ২৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন তো শুধু অতিরিক্ত পানির দাম না, পয়োনিষ্কাশন বিলও আমাদের অতিরিক্ত গুনতে হবে। এটি আমাদের জন্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা তামিম হোসেন বলেন, পানি মুখে দিলে গন্ধ আসে। সেখানে ২৫ শতাংশ পানির দাম বাড়ানোর কোনো মানেই হয় না। ভোক্তা অধিকারবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, ওয়াসার বেশির ভাগ এলাকার পানি অনিরাপদ। ভোক্তা টাকা দিয়ে অনিরাপদ পানি ক্রয় করছে। তার ওপর ভোক্তার স্বার্থের কথা চিন্তা না করে নিজেদের সুবিধার জন্য এভাবে স্বেচ্ছাচারিতা মূলক মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই মানা যায় না। এটি ভোক্তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, পানির দাম না বাড়িয়ে বিকল্প কিছু আমাদের ছিল না। দাম না বাড়ালে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকতে পারবে না। দিন দিন এভাবে চললে প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে। অন্য কোনো জায়গা থেকে ঋণ করতে হবে। আর সামান্য প্রেসার নিলে মানুষ বৃহত্তর অর্থে উপকৃতই হবে।