নাট্যম রেপার্টরি ধীরে ধীরে তাদের কাজের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে পরিচিতি পেয়েছে। আর এই নাট্যদলের কর্ণধার নাট্যজন আইরিন পারভীন লোপা। নির্দেশনা তার প্রথম পছন্দ। বাংলাদেশের বিভিন্ন নাটকের দলে নির্দেশনার কাজ করেছেন। এখনো অনেক দলেই তার নির্দেশিত নাটক নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে। নির্দেশক আইরিন পারভীন লোপার সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
বাংলাদেশের রেপার্টরি থিয়েটারের গতি-প্রকৃতি কেমন মনে হচ্ছে?
বর্তমানে বাংলাদেশে রেপার্টরি থিয়েটারের অবস্থা আমার কাছে খুবই আশাব্যঞ্জক। একটা সময় যখন বাংলাদেশে শুধুই গ্রুপ থিয়েটার চর্চা চলত তখন এই কনসেপ্টটা কারো কখনোই মাথায় আসেনি। কিন্তু আমরা প্রথম দেখলাম, এনএসডি থেকে কয়েকজন বাংলাদেশে এসে চিলে কোঠার সেপাই নাটক হিসেবে মঞ্চে এনে প্রথম রেপার্টরি থিয়েটারের কনসেপ্ট বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করল। সেটা আমি বলব, নাট্যকর্মীদের রেপার্টরি থিয়েটারের স্বপ্ন দেখার শুরু। সেই স্বপ্নটাকে আরেকটু এগিয়ে দিয়েছিল মামুনুর রশীদ বাঙলা থিয়েটার করে। তারপর আমরা দেখলাম সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)। যদিও এই নাট্যদলগুলোর কার্যক্রম বর্তমানে কমে গিয়েছে। এরপরই দেখছি অনেকগুলো রেপার্টরি নাটকের দল। তাদের কাজগুলোও অনেক প্রশংসার যোগ্য এবং তাদের পুরো ভাবনা জুড়েই রেপার্টরি থিয়েটারের মানসিকতা এবং সেই পেশাদারিত্বটাও আছে। তাদের সকল কার্যক্রমেই তার ছাপ পাওয়া যায়।
নতুন নাট্যকার ও নির্দেশকের কাজে কতটা আশাবাদী? নতুন জেনারেশান তৈরি হচ্ছে কি?
নতুন জেনারেশান খুব একটা যে তৈরি হচ্ছে সেটা আমি জোর গলায় বলতে পারি না; কিন্তু আমাদের কিছু কিছু নবীন যারা নাটক লিখছে তাদের লিখনীর ধরন এবং চিন্তা-ভাবনা কিন্তু খুবই উচ্চমার্গের। যদি তাদের কাজের ধারাবাহিকতা থাকে তবে আমি মনে করি, এখন আমাদের বাংলা নাট্যের যারা শ্রদ্ধার পাত্র আছেন—আজকের নবীনরাও সেই জায়গায় যেতে পারবে। আমাদের বেশ কিছু ছেলে এবং মেয়ে নাট্যকার এই সময়ে বেশ ভালো লিখছে। তবে নাট্যকার শুধু ভালো লিখলেই তো হবে না। সেই নাটকগুলো মঞ্চে আসাটাও অনেক জরুরি। এখন মঞ্চে সেই পরিমাণ নাটক আসছে না বলেই হয়ত আমরা বলতে পারছি না যে, আমাদের নবীন নাট্যকাররা অনেক ভালো লিখছেন। আবার নবীন যারা নির্দেশনায় যুক্ত তারাও প্রবীন বা প্রতিষ্ঠিত নাট্যকারের নাটক নিয়ে কাজ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সেক্ষেত্রে হয়ত কোনো ঝুঁকি থাকে না। তবে আমাদের নবীনরা যে পরিমাণ লিখছে সেই পরিমাণ নাটক মঞ্চে আসছে না। নবীনদের নাটক নিয়মিত মঞ্চে আসলে তারা অনেক বড় জায়গা করে নিবে বলে বিশ্বাস করি। সব মিলিয়ে নতুনদের নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী।
সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের থিয়েটার কোন দিকে এগুচ্ছে বলে মনে হয়?
অতীত সব সময়ই বর্ণিল, তাই না? বর্তমানকে সবাই অতীতের সঙ্গে তুলনা করে। কিন্তু অতীতে যেসকল সুযোগ-সুবিধা ছিল সেগুলো কি আর এখন আছে? মানুষের চাহিদা অনেকগুণ বেড়েছে, সময় কমেছে। আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন সব জায়গায় হলেও শুধুমাত্র থিয়েটারে হয়নি। সবকিছুর দাম বেড়েছে কিন্তু থিয়েটারের টিকিটের দাম বাড়েনি। কেউ যদি টিকিটের দাম বাড়ায় তাহলেই অনেকের মধ্যে হায় হায় রব উঠে যায়, কিন্তু তারা কোনোভাবেই এখনকার জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে থিয়েটারকে তুলনা করে না। এখনো কিভাবে পঞ্চাশ বা একশো টাকার টিকিট রাখা সম্ভব! সেগুলো কেউ লক্ষ্য করছেন না। সব মিলিয়ে আমি বলব, আশার দিকও আছে আবার হতাশার দিকও আছে। আশার দিক হলো আমাদের থিয়েটারে এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে; আর হতাশার দিক হচ্ছে আর্থিক দিক দিয়ে থিয়েটারের দলগুলো কোনো সহযোগিতা পাচ্ছে না। আমি মনে করি, আমাদের এখানে বিশ্বমানের নাটক হচ্ছে আর এই নাটকগুলোকে অনেকদিন ধরে রাখতে হলে পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন আছে।
আপনার বর্তমান কাজ নিয়ে কিছু বলতে চান কি-না?
নতুন কাজ বলতে আমি কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে নাটকটা করেছি সেটা ‘বাঘ’। নাসরিন মোস্তফার লেখা নাটকটি দৃশ্যকাব্য থেকে মঞ্চে এসেছে। আর এর বাইরে যেটা আসলে রিহার্সেল করছি সেটা হচ্ছে মোহন রাকেশের ‘লেহরোকা রাজহংস’। মোহন রাকেশের হিন্দি ভাষায় লেখা এই বিখ্যাত নাটকটির বাংলায় অনুবাদ করেছেন অংশুমান ভৌমিক। সেটারই কাজ চলছে পুরোদমে। আশা করি সবকিছু ঠিক থাকলে এটা ঈদের পরপর মঞ্চে আসবে। আমি আসলে নাট্যম রেপার্টরি গঠন করার পর থেকে সব সময় মনোযোগী হয়েছি ভিন্নধারার কাজ করার দিকে। সেদিক থেকে নাটকের পাণ্ডুলিপি আমার কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।
নতুন অভিনয়শিল্পী তৈরি হচ্ছে কতটা বা কর্মীদের মধ্যে অভিনেতা হয়ে ওঠার সম্ভবনা কেমন?
নতুন অভিনয়শিল্পী যে তৈরি হচ্ছে সেটা আমি বলতে পারছি না। তার কারণ হলো— এখনকার প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের ধৈর্য্য অনেক কম। তারা খুব অল্পতেই সবকিছু চায়। মঞ্চ-তো স্কুলিংয়ের জায়গা; মঞ্চে কাজ করার জন্য নানা কিছু রপ্ত করতে হয়, চর্চা করতে হয়। এসব করার মতো এখনকার ছেলে-মেয়েদের এত সময় নেই। তাদের কাছে মনে হয়— আসব আর সবকিছু করে ফেলব; মঞ্চে দাঁড়ালেই তো সব হয়ে যাবে! নিজেকে দেখানোর একটা প্রবল প্রবণতা তৈরি হয়েছে এখনকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে। সেদিক থেকে আমি অনেকটা আশাহতই বলব।
ছবি রঞ্জু সরকার
