টিটুর তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী

ত্রিমাত্রিক আবহের গাঢ় চিত্রকলা

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২০, ১৯:২৮

চিত্রকর আবু সালেহ টিটুর তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় জাদুঘরে। ‘রাস্টি অ্যালিউরস’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে ৪৩টি চিত্রকর্ম প্রদর্শন করা হয়। টিটুর এবারের প্রদর্শনীর প্রতিপাদ্য নগর। এই নগরীর কাঠামো, বসতি, মানুষ, প্রেম, একাকীত্ব, লৈঙ্গিকতা, বিষণ্নতা ও উদযাপন, আলোক ও আঁধার অভিব্যক্তি পেয়েছে তার ছবিগুলোতে। প্রগাঢ় রংয়ের ব্যবহার, অত্যুজ্জ্বল আলোকের অর্থপূর্ণ ও সাংকেতিক প্রক্ষেপণ এবং সর্বোপরি এক ধরনের ত্রিমাত্রিক আবহ টিটুর এই চিত্রকর্মগুলোয় বিশিষ্টতা দিয়েছে। যেমন নগরীর বৃষ্টিপাতের যে ছবিটি তিনি এঁকেছেন, তার সামনে দাঁড়ালে আপনার মনে হবে বৃষ্টি যেন ক্যানভাস পেরিয়ে আপনার গায়ে এসে পড়ছে। এমনকি সেই বৃষ্টির শব্দও  যেন আপনার কানে বাজছে। তবে ত্রিমাত্রিক আবহের ছবি আক্ষরিক অর্থে ত্রিমাত্রিক নয়। কিন্তু ছবির সামনে দাঁড়ালে আপনার মনে হবে, এই ছবির যে বিষয়বস্তু তা থেকে আপনি বিচ্ছিন্ন নন।

ত্রিমাত্রিক আবহের বিষয়ে শিল্পী জানালেন, এবারের ছবিগুলো আঁকতে গিয়ে তিনি তুলির চেয়ে স্প্যাচুলা, অঙ্কনে ব্যবহূত হয় এমন এক ধরনের ছুরি ব্যবহার করেছেন বেশি। ফলে ছবির গায়ে এক ধরনের গভীরতা তৈরি হয়েছে এবং সেই কারণেই এই ত্রিমাত্রিকতার আবহ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।  ‘রাস্টি অ্যালিউরস’ শীর্ষক যে ছবিগুলো তিনি এঁকেছেন তার একটিতে নগরীর দালানের দুর্ভেদ্য বিন্যাস, আরেকটিতে নগরীর প্রান্তসীমায় আলো দেখা যায়। জরাজীর্ণ এই শহরের শৃঙ্খলে আটকেপড়া মানুষের বদ্ধতার অনুভূতি, আর তার মুক্তির স্বপ্নালোকের মধ্যে এই প্রদর্শনীর নামকরণের মূলভাবনা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। নগরের ইট-কাঠের জঞ্জালের মধ্যেও টিটু মানবিক অভিব্যক্তি, ছন্দ-সুষমার অনুসন্ধান করেছেন। তার নিরেট প্রকোষ্ঠের মধ্যে তিনি দেখতে চেয়েছেন প্রেম। যদিও সেই প্রেম পান্ডুর, গতানুগতিক অনুজ্জ্বলের মধ্যে মঞ্চস্থ। আবার ধাতব বস্তুর সহাবস্থানের মধ্যেও তিনি উপমা খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসার।

এদিকে বেদনানীল নারীর বিভিন্ন প্রতিমা, বিষণ্ন প্রহরও তিনি এঁকেছেন। নগরীর নিষ্প্রাণতার মধ্যে আবদ্ধ শিল্পীমানস গ্রাম-জীবনের তৃষ্ণায় সবুজের সমারোহ ঘটিয়েছেন শহরের গায়ে। নীলের বিচিত্র বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন বহুধাবেদনার বিস্ফোরিত কোলাজ। আবার আবছায়া বিষণ্নতার সমান্তরালে আয়োজন করেছেন রঙের বর্ণিল উদযাপনের।

টিটুর এই প্রদর্শনীর অন্তত দুটো বিশিষ্টতা লক্ষণীয়—এক, রঙ্গের প্রগাঢ় ব্যবহার। দুই, নগরজীবনের যন্ত্রণাসমূহের অভিব্যক্তির মূর্তায়ন। যে ধূসর জনাধিক্যের সংকটগ্রস্ত ঢাকায় আমাদের অধিবাস, চিত্রকলায় তার পুনরুত্পাদন বা পুনরাবিষ্কার করেননি টিটু। বরং ঢাকাকে নিজস্ব বর্ণিলতা দিয়ে নতুন অর্থময়তা দিয়েছেন। সেটা করতে গিয়েই প্রগাঢ় রঙের ব্যবহার। রঙের এই বিশিষ্ট ব্যবহার একদিকে যেমন ঢাকার জীবনের বিভিন্ন দিককে আমাদের কাছে নতুনভাবে উন্মোচন করেছে, তেমনি তার সৃজনকর্মকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য। সংবেদী শিল্পীমানসে সমষ্টির সঙ্কট হয়ে ওঠে ব্যক্তির। ফলে ঢাকা নগরীর সমূহ সঙ্কটকে তিনি বিভিন্ন অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে শামসুর রাহমানের ‘দুঃখ’ কবিতাটি প্রাসঙ্গিক। কবি তার জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গে পরিব্যপ্ত দুঃখ অনুভব করেছিলেন। একইভাবে টিটু নগরজীবনের নির্লিপ্ততা, বিষণ্নতা, বিচ্ছিন্নতা, নিষ্প্রাণতা ইত্যাদি নগরের বিভিন্ন আনুষঙ্গিক আয়োজন রঙের মাধ্যমে তার চিত্রকলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। টিটুর এ চিত্রকলা বাংলাদেশের বতর্মান সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য শিল্পভাষ্য হিসেবে থেকে যাবে বলেই আমার অনুমান।