পত্রিকার রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, হঠাত্ বিত্তশালী হইয়া উঠা সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিত্ত-বৈভবের বিবরণসংবলিত একটি গোপন প্রতিবেদন সরকারপ্রধানের নিকট জমা দেওয়া হইয়াছে। প্রদর্শিত আয় নাই, বিশেষ কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবসায় নাই—অথচ বিশাল বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়িয়া তুলিয়াছেন, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য হইতে শুরু করিয়া জেলা, উপজেলা, থানা এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও রহিয়াছেন। জানা গিয়াছে, খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উহা দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, ‘একটা মানুষের বেঁচে থাকতে কত টাকা লাগে? এরা কি টাকা কবরে নিয়ে যাবে? কেন তারা এসব করে?’ তিনি এই সকল হঠাত্ বিত্তশালীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলিয়াছেন এবং সেই মোতাবেক সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে বলিয়া আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পর্যায় হইতে জানানো হইয়াছে। উল্লেখ্য, ঐ তালিকায় যাহাদের নাম রহিয়াছে তাহাদের কেহ কেহ এক-দুই বত্সরেও নিজের অবস্থার আমূল পরিবর্তন করিয়াছেন।
ইহা খুবই ভালো উদ্যোগ এবং সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। যাহারা হঠাত্ করিয়া ফুলিয়া কলাগাছ হইয়াছেন তাহারা নিশ্চয়ই বৈধ পথে উপার্জন করিয়া হন নাই। পাশাপাশি দলীয় পরিচয় ও প্রভাব খাটাইয়াছেন তাহাও নিশ্চিত। এখন তাহাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা বলিতে আমরা বুঝি দল হইতে বহিষ্কার অথবা পদচ্যুত করা। ইহাতে এই সকল ব্যক্তির খুব বেশি কিছু যাইবে-আসিবে না। কারণ তাহারা দলের রাজনীতিতে আছেন আদর্শ-নীতির দিকে তাকাইয়া নহে, বরং অর্থ উপার্জনকেই মুখ্য উদ্দেশ্যের উপর ভর করিয়া; কিন্তু প্রশাসনিক যে ব্যবস্থা লইবার কথা বলা হইয়াছে তাহা কতটা সম্ভব হইবে? এই সকল ব্যক্তির এত অর্থ-প্রতিপত্তি হইয়াছে যে তাহারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের একটি অংশকে পকেটে পুরিয়া লইয়াছে। সেই কাজেও তাহারা অবৈধ অর্থ এবং তাহাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করিয়াছেন। ফলে সরকারপ্রধান তাহাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাইবেন বলিয়া মনে হয় না।
এই বর্তমান উদ্যোগের মধ্যে সরকারপ্রধানের হতাশার বহিঃপ্রকাশই ঘটিয়াছে। ইহাও ঠিক, এই ধরনের উদ্যোগের মধ্য দিয়া যতটা লাগাম টানিয়া ধরা যায় ততটাই মঙ্গল দেশ ও দলের জন্য। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযানের প্রয়োজনীয়তা সর্বদাই ছিল; কিন্তু গুরুত্ব সহকারে তাহা কখনোই করা হয় নাই। বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি হইতে বাহির হওয়া অতি প্রয়োজন। আর তাহা করিতে হইলে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করিতে হইবে। প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করিতে হইবে সরকারের নিকট, অর্থাত্ সরকারে থাকা দায়িত্বশীলদের নিকট, সরকারি দলের নিকট নহে। তাহা হইলেও খানিকটা অবস্থার পরিবর্তন হইবে বলিয়া আমরা মনে করি।
