মার্কিন-আফগান শান্তিচুক্তি

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২০, ২১:৪৭

মো. বিপ্লব আলী

আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার একটি যোদ্ধা জাতি। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব ব্যাপক, তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করেও টিকে থাকতে পারেনি, আমেরিকা একই পথে দাঁড়িয়ে, প্রায় ১৯ বছর যুদ্ধের ইতি টানতে আমেরিকা তালেবানের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ ও তালেবানের রাজনৈতিক প্রধান মোল্লা আবদুল গণি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিতে বলা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ১৪ মাসের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করবে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ হাজার ও ন্যাটোভুক্ত ৩৯ রাষ্ট্রের অংশীদারীদের ১৭ হাজার সেনা মোতায়েন আছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৩৫ দিনের মধ্যে সেনা সংখ্যা ৮ হাজার ৬০০ তে নিয়ে আসবে, শর্ত তালেবানকে তাহাদের অঙ্গীকার রাখতে হবে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানের আলকাইদা নামক দলের নেতৃত্বে আমেরিকার টুইন টাওয়ার্স আক্রমণের মধ্য দিয়ে মার্কিন-আফগান যুদ্ধের সূচনা হয়। ইতিহাসে এই ঘটনাটি নাইন-ইলিভেন নামে পরিচিত। তালেবানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই দশকের বেশি যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক যা আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থি। আমেরিকার ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন সেই প্রতিশ্রুতিতে তালেবানের সঙ্গে চুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় আফগানিস্তান নিজেদের প্রত্যেক সৈন্যের পেছনে বছরে খরচ হয় ১০ লাখ ডলার। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আফগানিস্তান ২০০১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার যা এখনো অব্যাহত। এই যুদ্ধে তাদের অন্তত ২ হাজার ৩০০ সৈন্য মারা গেছে এবং ২০ হাজার সেনা আহত হয়েছে। আফগান যুদ্ধে সরাসরি তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো লিপ্ত থাকলেও অন্যান্য দেশ পরোক্ষভাবে জড়িত। বড়ো শক্তি হিসেবে রাশিয়া, চীন, ইরান ও ভারতের স্বার্থ লক্ষ্য করা যায়। চীন ও রাশিয়া আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যিক কারণে আফগানিস্তান বিষয়ে আগ্রহ হলেও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচ্য। বর্তমান চুক্তি যেমন তালেবানকে লাভবান করবে, তেমনি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, আফগানিস্তানে মোতায়েনরত সৈন্যদের ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাহার করে নিবে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করছি শান্তিচুক্তি এবং সমঝোতার সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকবে।’ এখন আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসবে কি না তা সময়ের ব্যাপার, বর্তমান আফগান সরকার নারীদের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা করেছে। পরবর্তীকালে তালেবানের হাতে আফগানের ক্ষমতা চলে গেলে নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা, শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে তা সময়ের অপেক্ষায়। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতা থাকা অবস্থায় নারীদের আধুনিক শিক্ষা, চলাফেরার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছিল। আফগান সরকার আসরাফ গণি নারীদের সকল সুযোগ-সুবিধা দিলেও আমেরিকার তাবেদার সরকার নামে পরিচিত যা আফগানের সকল মানুষ তাকে গ্রহণ করতে পারেনি। আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্ রাজনীতির সমীকরণ কোন দিকে যাবে তা সময় বলে দিবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়