তিন পুরুষ

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ১৯:১৮

মুজিব কখনো কখনো নিজেকে সুপারম্যান মনে করে। তার মনে কখনো কখনো একটা অসীম এবং অদৃশ্য শক্তি জেগে ওঠে, টের পায়। তখন ভেতরে ভেতরে একটা অগ্নি অথবা অস্থিরতা তৈরি হয়। সে তার ফ্যামিলি ডাক্তারকে এই অস্থিরতার কথা বলেছে। কিন্তু কানাডিয়ান-বাংলাদেশি ডাক্তার সমস্যা ধরতে পারছে না। সে জানে কেউ কেউ শীতকালে পাগল হয়ে উইনটারফোবিক সিজোফ্রেনিয়াত আক্রান্ত হয়। আর বাকি সময় সুস্থ থাকে। শীতকালীন কুলম্যানের মতো মুজিবও মার্চ এবং আগস্টে অস্থির হয়ে ওঠে। রক্তকণিকায় অগ্নিস্রোত অনুভব করে।

একবার টরন্টোর ডাউন টাউনের এক সিনেকমপ্লেক্সে ‘ম্যান অব স্টিল’ দেখে ব্রিটিশ অভিনেতা হেনরি ক্যাভিলের ভূমিকায় নিজেকে ভাবে। তবে পুরোপুরি সেরকমও নয়। ছবিটা অবাস্তব। কিন্তু মুজিব বাস্তবে এক পরাবাস্তব পাওয়ার ধারণ করে। কখনো কখনো বাস্তব-অবাস্তব-পরাবাস্তব মিলিয়ে একটা ঘোর অন্ধকার মনে হয়। ডাক্তার তাকে স্পেশালিস্টের কাছে রেফার করেছিল। স্পেশালিস্টও তার মানসিক এবং শারীরিক নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছুই পায়নি। বলেছে, নো প্রবলেম! ইউ আর হানড্রেড পার্সেন্ট অল রাইট।

মুজিব নিজেই নিজের সমস্যাটা একপর্যায়ে আবিষ্কার করেছে। মুজিব, মুজিব, শেখ মুজিব! মুজিব নাম ধারণ করার ক্ষমতা তো তার নেই। তবুও সে আরেক মুজিব। যেমন শেখ মুজিবের মতো চেহারায় রয়েছেন আরেক লোক আরুক মুন্সি। স্বআবিষ্কৃত কারণটা সে কারো কাছে শেয়ার করে না। ভেতরে ভেতরে সে অদ্ভুত অহংকারবোধ করে; ঠিক অহংকারও না—গৌরব। নিজেকে গর্বিত মনে হয়। ঐতিহাসিক ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়তে পড়তে এলোমেলো হয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে, গ্রন্থের ভেতর কীভাবে চরিত্র লুকিয়ে থাকে! নামকরণের কারণে একটা অসমাপ্ত দায়িত্ববোধে জাগ্রত হয়।

দাদা হামিদ আর বাবা লুত্ফরের মতো মুজিবও একা একা প্রস্তুতি নেয় আরেক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটানোর জন্য। দাদা একজন কৃষক আর বাবা সাধারণ চাকুরিজীবী। দাদা বাস করতেন গ্রামে, বাবা ছিলেন শহরে আর সে বিদেশে! যেন ধাপে ধাপে ধারাবাহিক জীবনের সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে মুজিব কানাডায় অভিবাসী। কানাডা এক শান্তির দেশ, বিশ্বের সেরা দেশ। মুজিব ভেবে কূল-কিনারা পায় না, কীভাবে এই শান্তিপূর্ণ দেশে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়! জেনেছে, আইনের ফাঁকে অত্যন্ত আরামে আছে এক খুনি! বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মানুষটিকে খুন করে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে। পায়নি। তার আবেদন চার চার বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও আয়েশে বাস করছে টরন্টোর ইটোবিকোতে। ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা খুনিটাকে দীর্ঘদিন অনুসন্ধান করে তার অবস্থান খুঁজে বের করেছে মুজিব।

মুজিবের সহকর্মী নেপালের পায়রা কুমার। সহকর্মী হলেও সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। তারা ব্রেক টাইমে সবসময় ক্যাফেটেরিয়ার জানালার পাশের সিটে মুখোমুখি বসে লাঞ্চ করে। পুরো জানালা ঘিরে নানা জাতের ফুল আর ফুল। খেতে খেতে পায়রা জানতে চায়, তোমার নাম মুজিব। আচ্ছা, তোমরা শেখ মুজিবের মতো মহান নেতাকে কেন ওভাবে গুলি করে হত্যা করলে? গান্ধীকেও তো গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল!

মুজিব কী জবাব দিবে, কোনো জবাব খুঁজে পায় না! শুধু বলে, সেটা আমাদের ইতিহাসের কালো অধ্যায়।

পায়রা বলে, প্রতিবেশীরা যেমন প্রতিবেশীদের বাড়িতে ফুটে থাকা ফুলের সুবাস পায়, গাছের ছায়া পায়, রান্নার ঘ্রাণ পায়; তেমনি তোমাদের দেশের আনন্দ-বেদনা আমাদের স্পর্শ করত। আমি আমাদের প্রস্তর হিমালয় থেকে শেখ মুজিবের মতো মানব হিমালয় দেখতাম।

পায়রার কথাগুলো মুজিবকে আরো ভাবিয়ে তোলে। কুড়ি মিনিটের লাঞ্চ ব্রেক ফুরিয়ে যায়। কিন্তু তাদের কথা ফুরায় না। দুজনেই দ্রুত কাজে চলে যায়।

কাজ থেকে বাসায় ফিরে পায়রার কাব্যিক কথাগুলো মনে পড়ে। মনে পড়ে বাবার কথা। বাবা নেই, আছে বাবার মৃত্যুদিবস! পৃথিবীতে অনেক কিছুই অদ্ভুতভাবে কাকতলীয় হয়ে যায়। যেমন দাদা, বাবা আর নিজের নাম। পিতার মৃত্যু দিবসটাও জাতির পিতার সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে গেছে। তাই পনেরোই আগস্ট তার কাছে দ্বিমাত্রিক বেদনায় পূর্ণ। দেশে থাকতে এই দিনটিতে চলে যেত টুঙ্গিপাড়ায়।

মুজিবের বাবাও জাতির কলঙ্ক তিলক মোছার জন্য, পাপ মোচনের জন্য ১৯৯৮ সালে মাজার ‘জিয়ারত’ করেছিল। বাবার সেই জিয়ারতের গল্পটি এ রকম :

একজন সাবেক সচিব, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, আরেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাবা লুত্ফর এক অপরাহ্নে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে মেঘনা নদীতে বৈকালিক ভ্রমণে রওনা দিলো। সাথে নিলো লুত্ফরকেও। কিন্তু ভ্রমণের হৈচৈ নেই, আমেজ নেই। সবাই চুপচাপ, গম্ভীর। কী যেন একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, যা আগে থেকেই ছক কাটা! লুত্ফরকে তা জানানো হয়নি। সেও সব পর্যবেক্ষণ করছে। গোয়েন্দার মতো গাড়িটি ঢাকা শহর ছাড়িয়ে একটি মফস্বল শহরে হাজির হলো। তখন দাউদকান্দি বাজারে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের গাড়ি বাজারে ঢুকতেই কিছু লোকজন ছুটে এল। একটি বিয়েবাড়ি সাজানো। বর-বরণের গেট। তারা ভাবছে—এটাই বরের গাড়ি। পরে ভুল ভাঙল।

বাজার মসজিদে গাড়িটি থামিয়ে ড্রাইভার আর ব্যাংকার আছর নামাজ আদায় করলেন। এই ফাঁকে বাজার থেকে টুকটাক কেনাকাটা করল তারা। সাবেক সচিব কিনলেন পাঁচ মিশালি তাজা মাছ। আর মাছের শুঁটকি কিনলেন মুক্তিযোদ্ধা। বাবা লুত্ফর অযথাই কিনলেন একটি লাল গামছা।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে। বাজার থেকে বেরিয়ে গাড়িটি ঘুরিয়ে ঢাকার দিকে প্রত্যাবর্তন শুরু করল। সবাই নীরব, থমথমে। অল্প কিছু পথ আসতেই ড্রাইভারকে বলা হলো, ডান দিকে সরু পথে নেমে যাও। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা থেকে গাড়ি গ্রামের পিচঢালা পথে ঢুকে পড়ল। দুই দিকে গাছগাছালি। একপাশের গাছ, আরেক পাশের গাছের সাথে তোরণ তৈরি করে মিলেমিশে আছে। কোথাও জঙ্গল, কোথাও জলাশয়, আলোছায়া আর নির্জনতা ভেঙে গাড়ি যাচ্ছে দশপাড়ার দিকে। মোড়ে এসে একজন গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করা হলো, হুজুরের বাড়িটা কোথায়?

লোকটি আঙুল উঁচিয়ে দেখাল—ঐ যে মাদ্রাসা আর মাঠ দেখতাছেন, সেই রাস্তার মোড়ের বাঁ পাশের বাড়িটাই।

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। মাগরেবের সময়। গাড়িটা মাঠে থামানো হলো। মাঠের পাশে আদিগন্ত ধানখেত। আবারও দুই যাত্রী পুকুরে ওজু করে সবুজ ঘাসের জায়নামাজে নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়িতে বসে রইলেন সচিব সাহেব।

অপারেশনে নামলেন মুক্তিযোদ্ধা আর লুত্ফর। এরকম একটি অপারেশনে আসবে তা লুত্ফর এখন টের পেলো। তারা দুজন খুব সর্তকতার সাথে হুজুরদের বাড়িতে প্রবেশ করলেন। সামনে একটা ইটের তোরণের প্রাচীন গেট। ঢুকতেই বাঁ পাশে একটা ছোট্ট প্রাইভেট টিনের ছাপরা মসজিদ। তার পাশে কয়েকটি কবর। বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেই কবরস্থানের সামনে একটা মিনারের মতো ছাদ দেওয়া পাকা কবরঘর। সেটা হুজুরের আব্বার অর্থাত্ পির সাবের কবর।

তখন মসজিদে চলছে মাগরেব নামাজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে একমাত্র মাগরেব নামাজই তিন রাকাত। ফলে সময় কম। একজন নামাজি জামাত ধরার জন্য দৌড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, শেষ রাকাতে যুক্ত হবে। তাকেই জিজ্ঞেস করা হলো, ছোট হুজুরের কবর কোনটি?

লোকটি পাশের কবরের মাঝখানেরটি দেখিয়ে বললেন—‘ঐটা ঐটা’, বলেই ছাপড়া মসজিদে ঢুকে পড়ল।

মুক্তিযোদ্ধা আর লুত্ফর বাড়ির আঙিনায় ঢুকে চারপাশ দেখে নিলেন। পুরুটা রাজবাড়ি-রাজবাড়ি ভাব। মূল বাড়ির সাথে একটি পুরনো শেওলাপড়া মজা পুকুর। কিছুটা নির্জন। সেখানে লুত্ফর তৃপ্তির সাথে জল বিয়োগ করে নিজেকে হালকা করলেন। জলে ভিজে একটা ব্যাং লাফিয়ে উঠল। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। জ্বলছে জোনাক পোকা।  হয়তো আগন্তুক অতিথি দেখে পারিবারিক নেড়ি কুত্তাটা ঘেউ ঘেউ করতে করতে বাইরে থেকে বাড়িতে ঢুকল। এদিকে জল বিয়োগের পর লুত্ফরের মনে হলো পেট থেকে দীর্ঘদিনের একটা পাথর নেমে গেল। ও শান্তি।

এবার ফেরার পালা। প্রাইভেট মসজিদে নামাজ শেষ। মোনাজাত চলছে। মুক্তিযোদ্ধা কিছু বোঝার আগেই মুহূর্তের মধ্যে লুত্ফরের অপারেশন শেষ! নিজের অজান্তেই বা পায়ের জুতো খুলে মাঝখানের কবরে ছুড়ে মেরে ‘কবর জিয়ারত’ করে!

তারপর তারা দুজন দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে—অনেকটা হেঁটে, অনেকটা দৌড়ে। কারণ, নামাজ শেষ হলেই মুসল্লিরা বেরিয়ে আসবে। মুক্তিযোদ্ধার মনে পড়ে গেল ১৯৭১ সালের কথা! এ যেন আরেক অপারেশন!

মাঠে গিয়েই মুক্তিযোদ্ধা উত্তেজনায় বললেন, অপারেশন ১০০% সাকসেসফুল। এখানে থাকা আর নিরাপদ না; বিপদজ্জনক। ড্রাইভার ফরজ-নফল শেষ করে সুন্নত পড়ছিলেন। অর্ধেক সুন্নত রেখেই গাড়ি ছাড়তে হলো, গাড়ি ছুটলো রাজধানীর দিকে! তখন লুত্ফরের পায়ে কোনো জুতা ছিল না। খালি পায়ে নিজেকে মনে হলো আরেক মুক্তিযোদ্ধা। তারা ঢাকা ফিরে রমনার বাটা দোকান থেকে লুত্ফরকে দুই জোড়া জুতা কিনে দেয়। কারণ দুই জোড়া কিনলে এক জোড়া ফ্রি। আর সেই ফ্রি জোড়া পেয়েছিল মুজিব।

লুত্ফর ভাবে, মীরজাফরের মতো মোশতাক নামটি বিশ্বাসঘাতক এবং ঘৃণিত হয়ে গেছে। তার কী দুর্ভাগ্য, সাংবিধান মোতাবেক নব্বই দিন পদে না থাকলে কোনো রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সন্মান, অবসরভাতা পাবেন না। মোশতাক অবৈধভাবে মাত্র ৮৩ দিন ক্ষমতায় ছিল। পরে রাজনৈতিক দল করে প্রকাশ্যে একটি জনসভাও করতে পারেনি। ১৯৮০ সালের ২৩ মে বায়তুল মোকাররমে ডাকা জনসভা দেখার জন্য লুত্ফর গিয়েছিল। কিন্তু সেই জনসভায় সাপ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বোমা ফাটানো হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে ৫ মার্চ মারা যাবার পর বায়তুল মোকাররম মসজিদে জানাজা পর্যন্ত হতে দেওয়া হয়নি। পরে দাউদকান্দিতে নিজ বাড়িতে কবর দেওয়া হয়।

সেই কবর জিয়ারতের অপারেশন দশপাড়ার কাহিনি মুজিব তার বাবার কাছে শুনেছে, শুনেছে দাদা হামিদের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা, দাদার না ফেরার কথা এরকম :

হামিদ কোনোদিন বঙ্গবন্ধুকে দেখেননি। ১৯৭১ সালে থ্রি ব্যান্ড ভাঙা রেডিওতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভাষণ শুনেছে, অনেক কষ্ট করে। ওপরের এন্টেনা ঠিকমতো কাজ করে না। ভেতরে ব্যাটারিও গলে ঝং ধরে গেছে। শব্দ বাতাসের শন শন আর ঘ্যার ঘ্যার করে। এন্টেনা নাড়াচাড়া করতে হয়। তবু হঠাত্ বন্ধ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে থাপ্পর দিয়ে চলে। এভাবেই ভাষণ শুনে মন্ত্রমুগ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। নয় মাস পর হাতের কনুইতে বুলেটের যুদ্ধচিহ্ন আর জয় বাংলার পতাকা নিয়ে ঘরে আসেন। ব্যস, এই পর্যন্তই। যুদ্ধের পর হামিদ আবার কৃষিকাজে মন দেন।

প্রতিদিনের মতো কাকডাকা ভোরে মসজিদ থেকে ভেসে আসে—আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম। হামিদ ঘুম থেকে উঠে অজু করে ফজরের নামাজ পড়ে তার সেই ঐতিহাসিক এবং ভাঙা প্রিয় থ্রি ব্যান্ড রেডিও ওপেন করেন। কে একজন বার বার ঘোষণা দিচ্ছে—‘আমি মেজর ডালিম বলছি, আমি মেজর ডালিম বলছি, বাংলার মীর জাফর শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলার মীর জাফর শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। মীর জাফর মুজিব সরকারকে উত্খাত করা হয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে...।’

হামিদের মাথায় বজ পাত ঘটে। স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছর পর না যেতেই হঠাত্ পনেরোই আগস্টে এ কী নির্মম ইতিহাস! অবিশ্বাস্য ঘটনায় বিস্মিত হয়ে হামিদ চিত্কার করে ওঠেন—না না না!

হামিদ কোনোভাবেই কৃষিকাজে মন দিতে পারেন না। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সিদ্ধান্ত নেন ঢাকায় যাবেন বত্রিশ নম্বরে। এক শীতের সকালে ঢাকায় এলেন। বহু চেষ্টা করলেন বত্রিশ নম্বরে ফুল দিতে। কিন্তু কিছুতেই ধানমন্ডির ধারে কাছে যেতে পারছেন না। মনে মনে সিদ্ধান্ত পাল্টালেন। ফুল নয়, এবার উল্টো ঝাড়ু অভিযান। ঢাকায় দিনের বেলা থমথমে আর রাতের বেলায় কারফিউ। সারা শহরে আর্মির গাড়ির টহল। আজ মধ্যরাতে নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে চার নেতাকে জেলের ভেতর হত্যা করা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে জেলের ভেতর গুলি করে হত্যার নজির নেই! এ যেন জালিমের দেশ!

পরদিন নভেম্বরের চার তারিখ। পুরো ঢাকা শহর থমথমে! এই অস্থির সময়ে হামিদও অস্থিরতায় আক্রান্ত। আগের দিন তিনি ঠাটারি বাজার থেকে দুটি ঝাড়ু কিনেছিলেন। পরদিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে পুরান ঢাকার দিকে যান, ৫৪ আগামাসি লেনে। বাড়ির গেটে আর্মি পাহারা। মুক্তিযোদ্ধা হামিদ গেটের কাছে গিয়ে একাত্তরের গ্রেনেডের মতো ঘৃণা ছুড়ে দেন, ছুড়ে দেন থুতু, ছুড়ে মারেন ঝাড়ু। কিছু বোঝার আগেই হামিদ অ্যারেস্ট হয়ে যান। তারপর আর হামিদ ফিরে আসেননি।

অপারেশন দশপাড়া, অপারেশন আগামসি লেনের পর এবার মুজিব প্রস্তুতি নেয় অপারেশন ভালহাল্লার। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী, সাংবাদিক এবং ঢাকা থেকে আসা এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং সাংস্কৃতিক কর্মী অপারেশন ভালহাল্লায় যোগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত একজনও আসেনি। সবাই নানান অজুহাতে কেটে পড়েছে। হয়তো ভয় পেয়েছে, ঝামেলা হতে পারে। এটা তো বাংলাদেশ না, কানাডা। ৯১১ কল করলেই মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ এসে হাজির হবে। কে যেন তার কানে কানে গান শোনায়—যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে...

মুজিব একাই কিপলিং সাবওয়ের ট্রেন থেকে নেমে ১১১ বাস নেয়। বাস নম্বরটা ৯১১-এর মতো! বাসে উঠে টিটিসির ড্রাইভারকে ঠিকানা দেখিয়ে জানতে চায় কয়টা স্টপেজ, কতক্ষণ লাগবে? যদিও বাসায় গুগোল ম্যাপে সার্চ দিয়ে স্টাডি করে নিয়েছে।

কাঁধে একটি ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর অপারেশনের জিনিস! যথাসময়ে বাস থেকে নেমেই রাস্তা পার হতে দেড় মিনিটের পথ। বেশ নিরিবিলি আর পশ এলাকার একটা চারতলা বিল্ডিং। বিলাসবহুল এই বিল্ডিংয়ের তিন তলায় খুনি থাকে। সে নাকি এখন নানা রোগে; অভিশাপে অসুস্থ।

চারদিকে খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে মুজিব। হঠাত্ একটি পুলিশের গাড়ি আসে। একটু থমকে থেমে যায় মুজিব। ভেতরে একটা আতঙ্ক কাজ করে। না, পুলিশের গাড়িটি বিপরীত দিকের বিল্ডিংয়ে থামল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটি কালো ছেলেকে ধরে নিয়ে দ্রুত চলে গেল।

ইটোবিকো এলাকায় কালোদের আধিপত্য বেশি। আর এখানেই খুনির স্বর্গরাজ্য। কালো মানুষ, কালো টাকা, কালো হাত ভয় পেলে চলবে না। আজ পূরণ করতেই হবে তিন পুরুষের কৃতিত্ব। মুজিবের ভেতর তখন সুপারম্যান পাওয়ারফুল হয়ে ওঠে!

আজ বাংলাদেশে ১৫ আগস্ট শুরু হতে যাচ্ছে। এখন ঢাকায় রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই করছে। টাইম জোনের কারণে টরন্টো ১২ ঘণ্টা পিছিয়ে। এখন স্থানীয় সময় ১৪ আগস্ট দুপুর প্রায় ২টা; আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি। মুজিব দাদার কথা ভাবে, বাবার গল্প মনে করে সাহসী হয়ে মোবাইলে ফেসবুকে লাইভ শুরু করে—‘আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীর বাসার সামনে। ১৯৯৬ সাল থেকে সস্ত্রীক খুনি কানাডায় অবৈধভাবে বাস করছে। এই বিল্ডিংয়ের তিনতলায় তার অবস্থান...’

তিন মিনিটের মতো লাইভ শেষ করে উত্তেজেনায় কাঁপতে থাকে মুজিব। তারপর সতর্কতার সঙ্গে বিল্ডিংয়ের সামনের গেটে যায়। গেটের পাশে নিচতলায় সিরামিক ইটের দেয়ালে ঘেরা। একটা লোহার গেট। গেটের ফাঁক দিয়ে বাগানের ফুল গাছ দেখা যায়। গেটের সাথে একটা মাঝারি মেপল গাছ। গাছের ছায়ার দাঁড়িয়ে মুজিব কী যেন কী ভাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাঁধের ব্যাগ থেকে বের করে একটি জুতোর ফিতে দিয়ে আরেকটি স্যান্ডেল গেরো দেয়। একবার ভাবে খুনির ফ্ল্যাটের সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু গেট তো খোলার উপায় নেই আর নিরাপত্তার প্রশ্নটিও আছে। তাই গাছে ঝুলিয়ে দিতে গিয়ে থেমে যায়। এক কদম এগিয়ে লোহার গেটে ঝুলিতে দেয় ঘৃণার প্রতীক জুতো-স্যান্ডেল। সেই দৃশ্য ধারণ করতে করতে মুজিব নিজে বলে ওঠে : জয়বাংলা!

খুনির বাসার গেটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকার মতো ঝুলতে থাকে জুতো-স্যান্ডেল!