আর কি হবে এমন জনম, বসবো সাধু মেলে

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ১৯:২১

লালনবাড়িতে কেন যান? প্রশ্ন করলে, আমি একদাগে উত্তর দিতে পারি না। উত্তর দেবার আগে দুজনের ছবি ভেসে ওঠে। একজন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অন্যজন পাবনার শতোর্ধ্ব বাউল ইয়াকুব ফকিরের। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছিলেন—

‘...তাঁরা (বাউলরা) গরীব। পোশাক-পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝবার জো নাই তারা কত মহত্। কিন্তু কত গভীর বিষয় কত সহজভাবে তারা বলতে পারত।’

...একবার কথা প্রসঙ্গে ইয়াকুব ফকিরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম—এখানে আসেন কেন! প্রশ্ন শুনে ইয়াকুব ফকির হেসে ফেললেন—বাড়িতে মন টেকে না। তাছাড়া লালনে আসি, এখানে পাঁচটা মানুষের মুখ দেখি। পাঁচটা জ্ঞান বাড়ে। মানুষের রূপ না দেখলে আমি থাকতে পারি না। কী অপূর্ব কথা! যেন আমার মনের কথাটাই বলে দিলেন তিনি—বাড়িতে মন টেকে না। সে যা-ই হোক, ২০০৭/৮ সালের দিকে বলতে গেলে প্রতিদিনই বাউলদের সঙ্গে দেখা হতো। এখন দূরে থাকার কারণে হামেশাই যেতে না পারলেও মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা দোলপূর্ণিমার মচ্ছব পারতপক্ষে বাদ যায় না। ফকির লালন ফাগুনের জ্যোত্স্নায় রাতভর মচ্ছব করতেন। সে ধারা মেনে এখনো প্রতি ফাগুনে দোল বুঝে মরা গাঙের পাড়ে সাধুদের বাজার বসে। লালনকালে দুই দিনের আয়োজন এখন তিন দিনে গিয়ে ঠেকেছে। দিনাজপুর থেকে লালনবাড়ি। সাড়ে তিনশো কিলোর ফাঁক। তাতে কি! ‘সে আর আমি একখানে রই, তবুও লক্ষ যোজন ফাঁকরে আমি; একদিনও না দেখিলাম তারে।’ স্বভাবে ভাব হলে উপায় কি! চলে গেলাম কুষ্টিয়ার বারামখানায়। ছেঁউড়িয়া ছুঁতে ছুঁতে দুপুর টলে পড়ল। ক্রমেই মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। হরেক বাউলের হাট বসেছে আখড়ায়। কত কিসিমের সাধু বাউল যে আছে—না দেখলে বোঝার উপায় নেই, বিচিত্র তাদের বেশভূষা, অদ্ভুত তাদের কীর্তিকরণ। আখড়াবাড়ির আঙিনা, বারান্দা, মাঠ সবখানে খণ্ড খণ্ড গানের মজমা চলছে। দেখে দেখে বিকেল গড়িয়ে গেলে লালনসমাধির পাশে এসে দাঁড়ালাম। দূরাগত বাউলরা আস্তানা পেতেছেন এখানে। বৃদ্ধ বাউলের পাতানো চাটির পাশে দাঁড়াতেই হাসিমুখে বললেন—বসেন না ক্যানো, বসেন। জুতো খুলে ল্যাটা দিয়ে বাউলের পাশে বসে পড়লাম। বয়সী বাউলের ফকিরি নাম রুহুলশাহ্ ফকির। জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে আসেন কেন? রুহুল যেন তাচ্ছিল্য বোধ করলেন—‘এইবার শোনেন যেখানে বইসে আছেন, ইনির নাম হলো বিশ্ব বাউল সম্রাট। সম্রাট বোজেন, সম্রাট একটা কত বড় র্যাঙ্ক! বোজেন? ইনি বাতাসের সন্ধানকারী। ইনি কিন্তু নিরক্ষর ছিলেন, তাই বলে মুরুক্ষু নন। আমার রাসুলেরও অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তবে উনিরা মুরুক্ষু নন। তিনি, মানে বিশ্বনবী মোহাম্মাদ সাল্লাললাআলাইহিস সালাম। উনির উপরে পৃথিবীতে আর কিছু নাই। উনি সৃষ্টি না হলে দুনিয়াই সৃষ্টি হতো না।’ রুহুল ফকির লাগাতার বলতে গিয়ে কথার খেই হারিয়ে ফেললেন। অগত্যা দেহতাত্ত্বিক বিষয়ে জানতে চাইলাম—যেমন ধরেন, বাতাসের সাধনায় নারীদেহের যোগ আছে...? কথা শেষ করতে পারলাম না, রুহুল খেপে গেলেন—‘আরে দুরেরা, নারীর লগে তো কোনো কতাই নাই আপনার। বোঝানোর জন্য তিনি খেপামুখেই লালনপদ বলতে লাগলেন—

আপন সুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়

তাইতে ফেরেস্তাদের সিজদা দিতে কয়

পদ শেষ করে তিনি মুখ পানে চেয়ে সাপ্টা প্রশ্ন করে বসলেন—নাম কী আপনার?

বললাম—আজাদুর রহমান

সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন—‘আজাদুর রহমান’ সারেজাহান খুঁজলে আর পাবেন না। নাম পাবেন কিন্তু আপনার চেহারা পাবেন না। এটা হলো চেহেরে খোদা। আল্লাহ নিজ সুরাতে আপনাকে বানাইছে। পরিষ্কার করার জন্য তিনি ফের উদাহরণ টানলেন—যেমন আমার নাম রুহুল। রুহুল আর পৃথিবীতে নাই। নাম আছে, রুহুল নাই। এই বডিটা হলো আদম। আল্লাহ নিজ তরফ থেকে এর ভিতের রুহু ফুঁকারে দিয়েছেন। কোরানে দ্যাখেন আল্লামাল আদামা আসমাহা...।’ আয়াত বলে ফের ব্যাখ্যায় নামলেন—আদম তৈরি করে নিজ রুহু ফুঁকার পর আল্লাহপাক সকলকে সেজদা করতে বললেন।

পাল্টা প্রশ্ন করলাম, তার মানে আল্লাহ নিজেই ঢুকেছেন?

—‘হ নিজেই ঢুকছেন।’

রুহুল তেলওয়াত শুরু করলেন। এবার মানে—আল্লাহ বলেছেন, আমি মানুষের মাঝেই আছি। আল্লাহু কুল্লি...আমি গর্দানের শাহিরগের সন্নিকটেই আছি। বর্ণনা শুনে নিজের গলার রগ দেখিয়ে বললাম, এখানে? রুহুল ফের চিত্কার করলেন—‘আরে হ্যাঁ আল্লাহতায়ালা এরচেয়েও সন্নিকটে আছেন। তিনি সাত জমিন সাত আসমানে আছেন। সেই আল্লাহকে চিনছেন? আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে সেজদা করলে হারাম হয়ে যাবে। অন্ধকারে ডুব দিয়ে লাভ কি। কথা শেষ না হতেই পাশে বসা কাদের ফকির কথা কেড়ে নিলেন—ঐ মানুষের ভিতর আল্লাহ বসবাস করে, যে কাম ক্রোধ রস পার্থিব ঝামেলা থেকে নিজেকে সরাতে পেরেছে।

পাল্টাপাল্টি কথায় সুবিধা হলো প্রসঙ্গের তোয়াক্কা না করেই দিগিবদিকে প্রশ্ন করা যায়। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি মারা গেলে কী হবে?

—যদি কোনো ভালো গুণাবলি থাকে তবে সাঁইজির মতো এরকম একটা মাজার হবে।

—হোক, কিন্তু রুহুলটা কই যাবে?

—রুহুলটার জন্যি তো থান-ই আছে। ইল্লিন আর সিজ্জিল। পাপের কাজ করলে সিজ্জিল আর নেকিতে যাবে ইল্লিনে। সিজ্জিল মানে পাথর, জাহান্নামের পাথর আর ইল্লিন মানে হলো সুখস্বর্গ।

খেপিয়ে তোলার জন্য মহাযোগের কথা তুললাম। মহাযোগের সাথে তো নারীর যোগ আছে। কী বলেন?

‘মহাযোগ’ শুনে আব্দুল কাদের ফকির টিপ্পনি তুলে হেসে উঠলেন—হাঃ হাঃ একন বুজাও বাবা।

রুহুল এবার সত্যি ঝাঁঝিয়ে উঠলেন—

মহাযোগ নিজের সাথে। নারীকে তো আগেই নাথিং করে রাখিছে। ব্যাটাছেলের আবার মাসিক আছেনি? মহাযোগ বলতে তুমি কী বুজাও? নিজের যোগ। বউয়ের লগে কোনো যোগ নাই। হাওয়ার লগে কিসের গল্প। হাওয়াকে তো সৃষ্টির কৌশলে তৈয়ারি করেছে আল্ল­াহ। এখন বলেন হাওয়ার কোন কাঠামো তৈরি করেছে?  নকশা আছে? আদমের বডিতেই হাওয়ার উত্পত্তি। কথা হলো আমি নারী, আমিই পুরুষ।

ভালো করে বোঝার জন্য অবাক হলাম—পুরুষই নারী এ কেমন কথা!

রুহুল পাল্টা ব্যাখ্যা করেন—আমি নারী না হলে আমার বীজে মেয়ে হলো ক্যামনে! রুহুল আঙুলের ইশারায় ঘাসে ঘুমন্ত স্ত্রীকে দেখান—ই দ্যাকেন, এই বুড়িরে আমার প্রয়োজনে আনছি। জমি আনছি আবাদ করার জন্যি। মূলত আদমের মধ্যেই সব। এইডেই লালন সাঁইজি বলে গেছেন।

এরপর কথাবার্তার লাইন থাকে না। চারপাশে মানুষজন ভিড় করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন আবোল তাবোল প্রশ্ন করাতে রুহুল বিরক্ত হয়ে বেলাইনে চলে যান—ঐ যে দ্যাখেন ওখানে (মঞ্চে) ওয়াজ হচ্ছে। একটা করে লোক উঠবে একটা করে গান হবে। হেইডা ওয়াজ। একটা ওয়ার্ড ভুল নাই। সন্ধ্যা হলে ঐ দিকে যাইতে পারবেন না। বহু লোক যন্ত্রাপাতি আর গাড়ি নিয়ে বসে থাকবে।

আলাপের ফাঁকে আমরা লাল চা খেয়ে নিই। আব্দুল কাদের চায়ের দাম মেটালে রুহুল পুঁটলি থেকে কাপড় বের করেন। তারপর ধপধপে কাপড়টা আমার মুখের সামনে এনে বলেন, এইটা হলো খিলকা। ফকির হবার পর সাদা কাপড় নিয়েছি। এখন জানডা চলে গেলে এ দিয়েই কাফন পরা যাবে। কাফনের কাপড় যখন নিয়েছি সুতরাং রঙ্গরস আর নাই। আপনিতো এখনো রঙ্গরসের মধ্যেই আছেন। রঙ্গরস ছেড়ে সাদা কাপড় পরেন। তখন এত কথা আর বলতে হবে না। অটোমেটিক উত্তর পেয়ে যাবেন।

পুনরায় হৈ-হুল্লোড়ে কথার সাবজেক্ট এলোমেলো হয়ে যায়। আধ্যাত্মিক কথাগুলো কেবল রুহুল আর কাদের ফকিরের মুখ থেকে মুখে লাফাতে থাকে। কি মনে করে আচমকাই ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলি—নেশাপাতি করেন না?

—একবার যে সিদ্দি (সিদ্ধি) খেয়েছি সে রসেই তো শ্যাষ। গুরু দয়া করে পথ না দেখালে আরো কত বছর যে সিদ্দির নেশায় থাকতে হতো সে আল্লাহই জানে। সিদ্ধি নিয়ে তিনি আহাজারি করতেই থাকেন। কাদের সেদিকে যান না, মর্জিমাফিক গান ধরেন—

বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা

আর এক কানা মন আমার

এসব দেখি কানার হাটবাজার

উচ্ছ্বসিত কাদের ব্যাখ্যায় নামেন—ও বাউল, এবার স্পষ্ট বাংলায় বুজাই দ্যাও নিজের মধ্যে আমিত্ব থাকলে সাধনা হবে না। কাদেরের কথায় রুহুল বলতে শুরু করেন—সিদ্ধি তো আমরা ব্যাক খাইয়েই আইছি। সেটা ঐ নারীর লগে। নারী ভোগ করে আইছি। যা খাইছি সেই সিদ্ধির অ্যাকশন-ই তো এখন পর্যন্ত কাটি উঠতি পারিনি। আবার সিদ্ধি! যারা খায় তারা বুজুকগে।

এখন তাহলে কীভাবে এবাদত-বন্দেগি করেন?

—‘ওর ভেতর থেকেই। বাইম মাছের মতো প্যাঁকে থেকে, প্যাঁক যেন গায়ে না লাগে।’ কাদের কথা ধরে কপট মজা করেন—‘সাধু, সাধনকর্ম কও। না হলে বুঝবে ক্যামনে।’ কাদের উত্তরের অপেক্ষা করেন না; বরং গান ধরেন—

নাকের দুই ধারে দুই ফোঁড়া

ফকিরির গোঁড়া

ভব সাধন সাড়া

জানে রসিক যারা