তাত্পর্যপূর্ণ মাসের নাম হল রজব। মাহে রজবের আগমনের মাধ্যমে পবিত্র মাহে রমজানের শীতল বাতাস বইতে শুরু করে মুমিনের হূদয়ে। বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে যেমন শীতল বাতাস এসে বৃষ্টির আগমনি বার্তা দিয়ে যায়, তেমনিভাবে প্রতি বছর মাহে রজবও আমাদের মধ্যে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছাদূত হয়ে আগমন করে। রজব যেন আমাদের সবাইকে ডেকে বলে, হে সাধনা পিয়াসি মুমিন! যারা ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হতে চাও, যারা সিজদায় লুটিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহান স্রষ্টার সমীপে হূদয়ের আকুতি পেশ করতে চাও, যারা গুনাহের গন্ধে কলুষিত অন্তর-আত্মাকে তওবার মাধ্যমে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে চাও, যারা আত্মশুদ্ধির দরিয়ায় ডুব দিয়ে মহান মালিকের দিদার লাভে ধন্য হতে চাও, তারা পবিত্র মাহে রমজানের আগমনের সুসংবাদ গ্রহণ কর।
মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই বছরকে বারোটি মাস দ্বারা সাজিয়েছেন এবং এর মধ্যে চারটি মাসকে আশহুরে হুরুম তথা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে ইরশাদ করেন, আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এই মাসসমূহে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। (সুরা তওবা, আয়াত-৩৬) সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে রজব অন্যতম। বাকিগুলো হলো—জিলকদ, জিলহজ ও মহররম।
বিদায় হজের সময় মিনা প্রান্তরে প্রদত্ত এক ভাষণে মহানবি (স) সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। হযরত আবু বাক্রা (রা) থেকে বর্ণিত, মহানবি (স) ইরশাদ করেন, বারো মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক জিলকদ, জিলহজ ও মহররম। আর চতুর্থটি হলো জুমাদাল উখরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী মাস রজব। (সহিহ বুখারি)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তাআলা এই চার মাসের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। এ মাসগুলোতে গুনাহের ক্ষতি অনেক বেশি। আবার নেক আমলের সওয়াবও অধিক। ইমাম জাস্সাস (রহ) ‘আহকামুল কোরআন’ গ্রন্থে বলেন, এসব মাসে ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলে অন্য মাসগুলোয় ইবাদত করা সহজ হয়। অনুরূপ এ মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে বাকি মাসগুলোতেও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো, ‘আশহুরে হুরুম’ এর সম্মান রক্ষা করা, এ মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং বেশি বেশি নফল ইবাদতে মশগুল থাকা।
একটি হাদিস আমাদের অনেকেরই জানা, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রজব মাস আগমন করলে রাসুলুল্লাহ (স) এই দোয়াটি বেশি পড়তেন : ‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।’ অর্থ হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন এবং আমাদের হায়াতকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন। (নাসায়ি শরিফ) মহান আল্লাহ তাআলা রজব মাসের ২৭ তারিখে তাঁর প্রিয়বন্ধু মহানবি (স)কে মিরাজের মাধ্যমে স্বীয় দিদার দান করে এ মাসকে আরো মর্যাদাবান করেছেন। হযরত আবু বকর বলখি (রহ) বলেন, রজব মাস ঠান্ডা বাতাসের মতো, শাবান মাস মেঘমালার মতো, আর রমজান মাস হলো বৃষ্টির মতো। (লাতায়েফুল মাআরিফ)
মহানবি (স) রজব মাসে অধিক পরিমাণ ইবাদত-বন্দেগি করতেন; বিশেষ করে নফল রোজা রাখতেন এবং এ মাস থেকেই পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। সুতরাং এই মাসকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রতিটি মুমিনের জন্য বাঞ্ছনীয়।
—লেখক : মুফাসিসরে কোরআন, মাদ্রাসা শিক্ষক ও খতিব
