শাসন, সোহাগ ও আইন না মানার প্রবণতা

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ২২:১২

 ‘শাসন করা তাহারই সাজে সোহাগ করে যে’—ইহা ভীষণ প্রচলিত একটি প্রবাদ। এই উপমহাদেশে বর্তমানে প্রচলিত আইন-নিয়ম-কানুনের প্রধান ভিত্তি তৈরি করিয়াছিল ব্রিটিশরা। প্রায় দুই শত বত্সরের শাসনামলে তাহারা নিজেদের স্বার্থে কেবল শাসন করিয়াছে, সোহাগ করে নাই। সোহাগ করিবার কোনো তাগিদ বোধ করে নাই। কারণ, এইখানে তাহারা আসিয়াছিলই তাহাদের জাতিগত স্বার্থে, শাসনও করিয়াছিল নিজেদের প্রয়োজনটুকু ঠিকঠাক রাখিবার তাগিদে। ব্রিটিশরা চলিয়া যাইবার পর তাহাদের রাখিয়া যাওয়া আইন ও শাসনের নিয়ম রহিয়া গিয়াছে, কিন্তু শাসনের যেই মূল নিয়ম অর্থাত্ সোহাগও করা—তাহার ঘাটতি রহিয়াছে চরমভাবে। উলটোভাবে, কোথাও যদি অধিক সোহাগ করা হয় তো দেখা যায় শাসনের বালাই নাই। অর্থাত্ শাসন ও সোহাগের মধ্যে যে একটি ভারসাম্য থাকা দরকার, তাহারই নিদারুণ ঘাটতি রহিয়াছে এই উপমহাদেশে। উপমহাদেশের বলয়ের বাহিরে গেলেই ন্যূনতম আইনকানুন না মানিয়া থাকা যায় না, উন্নত দেশ হইলে তো কথাই নাই। কিন্তু কেবল এই অঞ্চলে প্রবেশ করিলেই যেন আমরা সবাই রাজা! কাহারো আইন মানিবার প্রয়োজন নাই!

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, মানবসভ্যতার সুষ্ঠু বিকাশের প্রয়োজনেই তৈরি হইয়াছে বিভিন্ন নিয়মকানুন। একটি গাছ জন্মাইতে যেমন আলো, মাটি, পানি ও বাতাস লাগে—তেমনি মানবসভ্যতার বিকাশ ও সুশৃঙ্খলতার জন্য সমাজ, রাষ্ট্র তথা আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ লাগে। একটি বৃক্ষকে আলো, মাটি, পানি কিংবা বাতাসের মতো যে কোনো একটি উপাদান হইতে বঞ্চিত করা হইলে গাছটি আর বাঁচিতে পারিবে না। আমাদের দেশে এখন প্রতি বত্সর লক্ষ লক্ষ লোক অহরহ উন্নত দেশে যাইতেছে-আসিতেছে। বাহিরে গিয়া তাহারা প্রতি পদক্ষেপ ফেলেন আইন ও নিয়মানুযায়ী। কিন্তু দেশে আসিলেই যেন মনে করেন এইখানে আইন বা নিয়মকানুন না মানাটাই দস্তুর। প্রকৃতপক্ষে, উন্নয়নশীল দেশসমূহের ভিতরে এখনো আধা-সামন্তবাদের গন্ধ দূর হয় নাই। সেই কারণে সকল কিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করিবার বিষয়টি তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রায়শই বিবর্ণ হইয়া পড়ে। কিছুদিন পূর্বে জরিপে দেখা গিয়াছে, ৯৮ শতাংশ তরুণই মনে করেন—সমাজে সততার ঘাটতি রহিয়াছে। আরো ভয়ংকর কথা হইল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সততা-বিষয়ক শিক্ষা না পাইবার কথা জানাইয়াছেন ৬২ শতাংশ তরুণ। সাধারণভাবে নিয়ম বা আইনকানুন মানিবার ক্ষেত্রে সততা ও শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনধারণের জন্য এই অঞ্চলে বিবিধ ধরনের প্রতিযোগিতা-রেষারেষি এতটাই অধিক যে, প্রায় সকলেই যেনতেন প্রকারে কার্য হাসিল করিতে ব্যগ্র থাকেন। ইহা বড়ো ধরনের সামাজিক সমস্যা। 

আইন ও নিয়মকানুন না মানিয়া পৃথিবীর কোনো দেশ উন্নতি করিতে পারে নাই। প্রকৃতি তথা বিশ্বজগতের ভিতরেও রহিয়াছে সুশৃঙ্খলতার অপূর্ব বিন্যাস। সেই অপূর্ব বিন্যাস দেখিয়া বুঝা যায়, সুশৃঙ্খলাই এই জগতের সবচাইতে বড়ো সৌন্দর্য। আমাদেরও সেই সৌন্দর্যকে ধারণ করিতে হইবে। জাতি হিসাবে উন্নতিসাধন করিতে হইলে ইহার কোনো বিকল্প নাই।