চীনসহ বিশ্বের ৯০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকায় বাংলাদেশের প্রবেশ রোধে সব বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কিন্তু বিমান ও স্থলবন্দরগুলোতে দুর্বল ব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি থার্মাল স্ক্যানারের মধ্যে দুটিই নষ্ট। এরমধ্যে ভিআইপি থার্মাল স্ক্যানার সাত দিন ধরে অকেজো হয়ে আছে। আরেকটি স্ক্যানার আরো আগে থেকে নষ্ট। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। কিন্তু ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভারদের পরীক্ষা করা হচ্ছে না। কলকাতাগামী ট্রেনযাত্রীরা স্ক্যানিংয়ের বাইরে রয়েছেন। সিলেট, বেনাপোল ও চট্টগ্রাম বন্দরে থার্মাল স্ক্যানার নষ্ট। বাংলাবান্ধ্যায় স্ক্যানিং নয়, শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সমুদ্রবন্দরে এখনো বসানো হয়নি থার্মাল স্ক্যানার। হ্যান্ডহেল স্ক্যানার দিয়ে পরীক্ষা চলছে।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া কথা শীর্ষ কর্মকর্তারা বলে আসছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের হাইকমান্ডও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় খোদ ডাক্তার-নার্সরাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রয়োজনীয় মাস্ক, গাউনসহ উপকরণ নেই। জনবলও সংকট। নতুন নতুন দেশে আক্রান্ত হচ্ছে, চাপও বাড়ছে, সেখানে জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, দুটি নষ্ট আছে। হাত দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম চালাচ্ছি। কোনো ধরনের অসুবিধা নেই। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে সব ধরনের ব্যবস্থা আছে। ডাক্তার-নার্সদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে মোংলা বন্দরে আসা একটি জাহাজের তিন নাবিকের শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা পাওয়ায় তাদের নামিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘সেরেনিটাস এন’ নামের ঐ জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের কাজও আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। মোংলা পোর্টের চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল আবুল কালাম আজাদ জানান, জাহাজটি ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রামে এসে কয়লা খালাস করে মোংলায় এসেছে। মোংলায় আসার পর বন্দরের পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল টিম নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বৃহস্পতিবার সকালে জাহাজে যায়। জাহাজের ২০ জন নাবিকের মধ্যে ফিলিপিন্সের তিন নাগরিকের শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা পাওয়া গেলে তাদের নামিয়ে এনে পরীক্ষার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়। তাদের মধ্যে দুই জনের জ্বর কমে গেছে। আরেক জনের জ্বর সামান্য আছে। তবে তিন জনকেই পৃথক ইউনিটে পর্যাবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এদিকে কুয়েতে যাওয়ার আগে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশিরা। অনেকের ভিসা-টিকেট সব ঠিক থাকলেও কুয়েত দূতাবাস এবং আইইডিসিআরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাদের যাত্রা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। মধ্যবয়সি হাসিনা বেগম ২৭ বছর ধরে কুয়েত আছেন। তিন মাসের ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসেছেন। আগামী ২৬ মার্চ ফিরতি ফ্লাইটে কুয়েত ফিরে যাওয়ার কথা তার। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রবেশদ্বারের সামনে ঘোরাঘুরি করছিলেন। হাসিনা বেগম বলেন, কুয়েত দূতাবাস থেকে তাকে এ প্রতিষ্ঠানে রক্ত পরীক্ষা করে করোনামুক্ত মেডিক্যাল সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখানকার কর্মকর্তারা কেউ দেখা করছেন না। তারা নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা মেডিক্যাল সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নন। কথাবার্তার একপর্যায়ে হাসিনা বেগম কুয়েতে ফিরে যেতে পারবেন কি না, তা জানতে চেয়ে বলেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে স্বামী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে বিদেশে থাকি। কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাই। এখন আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য কি কেউ নেই?
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, বাংলাদেশে কোনো করোনা ভাইরাস রোগী পাওয়া যায়নি। কুয়েত প্রবাসী যারা বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন, তারা কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসেননি। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত উপসর্গ বা লক্ষণও নেই, তাই তাদের পরীক্ষা করা কিংবা তাদের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট গ্রহণ প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। কুয়েত দূতাবাস থেকে কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা এ ধরনের পরীক্ষা করতে হবে বলে জানাননি। ডা. ফ্লোরা তাত্ক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসচিব এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি বলে তিনি জানান।
এদিকে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে দুবাই প্রবাসী যুবককে সিলেট শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বুধবার রাতে তিনি সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে গেলে করোনা সন্দেহে তাকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে।
