শফিকুর রহমান রয়েল
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভীতিকর পরিস্থিতির জানান দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বড়ো পুঁজিবাজারগুলোয় বাঘা বাঘা সব কোম্পানির শেয়ারের মূল্যে ধস নামে একযোগে। অস্বস্তিকর অবস্থাটা যে কী, তা সম্ভবত নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। আর বললেও সেটি হয়তো বাতুলতার পর্যায়েই পড়ে। দুনিয়া সম্পর্কে ন্যূনতম খোঁজখবর রাখা সকলেই জানেন যে, এক করোনা ভাইরাসই ধরণীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। যতোই ছড়াচ্ছে করোনা ভাইরাস, ততোই লক্ষণ বাড়ছে পৃথিবীর শীর্ষ অর্থনীতির কয়েকটি দেশের মহামন্দার কবলে পড়ার। এর কারণ বোঝাতে গেলে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই; কিয়ত্ পরিমাণে বিশ্লেষণমূলক বাক্যই যথেষ্ট—প্রাক-বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে প্রাদুর্ভাব মিশ্রিত হওয়াতেই পরিস্থিতি ভয়াবহতার রূপ নিয়েছে, যা থেকে বের হওয়া নিয়ে জন্মেছে নানা আশঙ্কা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, চীনে উদ্ভূত এই করোনা ভাইরাসই ধরার এক নম্বর সমস্যা, যা থেকে মুক্তি বি না রক্ষে নেই।
প্রথমেই আসা যাক জাপান প্রসঙ্গে। পৃথিবীর তৃতীয়-সর্ববৃহত্ অর্থনীতি ২০১৯ সালের চতুর্থ অর্থাত্ শেষ প্রান্তিকে সংকুচিত হয়েছে ১.৬ শতাংশ। বিক্রয় করের ঊর্ধ্বগতি ও শক্তিশালী টাইফুনের নেতিবাচক প্রভাবসমূহ হজম করাতেই এ পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের পর আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটিই সর্ববৃহত্ হ্রাসপ্রাপ্তি। নিকট প্রতিবেশী চীন করোনা ভাইরাসের প্রভাবে জর্জরিত হওয়াটা জাপানের অর্থনীতির জন্যেও অশনিসংকেত। প্রাদুর্ভাব ঠেকানোটা তাদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া জাপানের অর্থনীতি চীনের সস্তা কাঁচামাল ও শ্রমের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। চীন তার সমস্যা কাটিয়ে না উঠতে পারলে জাপানের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। সমস্যাটা যে শুধু চীনের একার নয়, বৈশ্বিক, এই বোধোদয় অবশ্য অনেক আগেই হয়েছে। বিশ্লেষকরা এটিকে ধরিত্রীর বিপর্যয় হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।
জার্মানির অবস্থাও ভালো নয়। ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো অর্থনীতি মহামারি শুরুর পূর্বে স্থবির অবস্থায় ছিল বললে ভুলই হবে; বলা উচিত সংগ্রামরত কারখানাগুলোর দ্বারা এগিয়ে যাচ্ছিল সংকোচনের দিকে। খুব কাছ থেকে জার্মানির অর্থনৈতিক বোধ প্রত্যক্ষ করা জেডইডব্লু সূচক ফেব্রুয়ারিতে এসে সামান্য পরিমাণে কমে যায় এই প্রতিফলন ঘটিয়ে যে, ভাইরাসটি বিশ্ব বাণিজ্যে বড়ো ধরনের আঘাত হানতে পারে।
ব্যাংক অফ আমেরিকার অর্থনীতিবিদ এথান হ্যারিস এমন কিছু বিষয় চিহ্নিত করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশসমূহও ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মন্দার মধ্যেই রয়েছে হংকং এবং সিঙ্গাপুরও খুব শিগিগরই একই পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার গত বছরের চতুর্থ প্রান্তিকের জিডিপি ছিল তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বাজে অর্থনৈতিক অবস্থা পার করছে মালয়েশিয়া। আর প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনখ্যাত চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক চাকাও ২০১৯ সালে এসে ধীর হয়ে গেছে। বিশেষ করে শেষ প্রান্তিকের অর্থনৈতিক নৈপুণ্য যাচ্ছেতাই। এসব কিছুই করোনা ভাইরাসের অভিঘাত প্রতিরোধে বৈশ্বিক অর্থনীতির সামর্থ্যের প্রমাণ তো দেয়ই না; উপরন্তু সামনের দিনগুলোর জন্যে আরো বেশি উদ্বেগের জন্ম দেয়। হ্যারিসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দীর্ঘায়িত বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতিই হচ্ছে এই সবশেষ দুর্বল প্রান্তিক। সেই আগুনে আরো ঘি ঢালছে এই করোনা ভাইরাস।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যুদ্ধবিরতির অভিমুখী হওয়াতে বৈশ্বিক সমদর্শিতা ফের ফিরে এসেছে। কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের কোম্পানিগুলো এখন পর্যন্ত রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে যে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও এতোটা শক্ত অবস্থানে নেই, যতোটা ভাবা হয়েছিল। আএইচএস মার্কিট তথ্য জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেবা খাত এ ফেব্রুয়ারিতে সংকোচিত হয় ৭৬ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন রিডিং সহকারে। চার বছরের মধ্যে এ মাসেই প্রথমবারের মতো সংকোচিত হলো তাদের সেবা খাত। চীনের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে যে সবসময়ই অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে হয়, এটি অনুধাবন করতে পেরেই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত ভারতের দিকে অধিক মনোযোগী হয়েছে। ক্রমান্বয়েই বাড়ছে এ দুই দেশের অর্থনৈতিক সখ্য।
—সিএনএন বিজনেস অনুসরণে
