কেন পুতিনকে প্রয়োজন এরদোয়ানের?

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২০, ২১:১২

বিবিসি

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়ার সঙ্কটে নিজেকে প্রধান ক্রীড়ানক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন। ইদলিব প্রদেশের সারাকেব শহরে গত মাসে সিরিয়ার এক বিমান হামলায় একসঙ্গে ৩৩ জন তুর্কি সৈন্যের মৃত্যুর ঘটনায় একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ এবং টালমাটাল হয়ে পড়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

যদিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারাকেবে বোমা হামলার লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহীরা, কিন্তু পরে বেশ কিছু গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যে তুর্কি সৈন্যরাও ছিল তা জেনেও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সাহায্যে সিরিয়া সেখানে হামলা চালায়।

গত ৩০ বছরে তুরস্কের সেনাবাহিনীতে একটি হামলায় এত বেশি প্রাণহানি হয়নি। এরপরও কেন ইদলিবে সিরিয়ার সঙ্গে লড়াই বন্ধ করতে চাইছেন এরদোয়ান? প্রথম কথা, সিরিয়ায় সেনা মোতায়েন নিয়ে তুরস্কের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য নেই। এরপর প্রায় ৫৫ জন সৈন্যের মৃত্যুর পর বিরোধী কিছু রাজনীতিক এরদোয়ানকে পরোক্ষভাবে দায়ী করতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন, ইদলিবের আকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ না নেওয়ার আগে সিরিয়ায় সৈন্য ঢুকিয়ে তাদের বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে সরকার। অভ্যন্তরীণ চাপকে অবশ্য তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস বলছেন, পুতিনকে চটানো এরদোয়ানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এরদোয়ানের পছন্দ হোক আর না হোক, সিরিয়ার সঙ্কটে রুশ প্রেসিডেন্ট নিজেকে প্রধান ক্রীড়ভনক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন এবং তার লক্ষ্য খুব পরিষ্কার, কোনোভাবেই বাশার আল আসাদের পরাজয় পুতিন চাইছেন না। মার্কাস বলছেন, ‘আফগানিস্তান এবং ইরাকে সামরিক হস্তক্ষেপ করার সময় পশ্চিমা শক্তিগুলোর পরিষ্কার কোনো লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু রাশিয়া জানে কেন তারা সিরিয়ায় গেছে এবং সেই উদ্দেশ্য থেকে তারা একপাও হটেনি এবং যে কোনো মূল্যেই তারা সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়।’

সিরিয়া ও রাশিয়ার যৌথ বিমান হামলায় সিরিয়ায় শহরের পর শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হয়েছে। লন্ডনে গবেষণা সংস্থা আইআইএসএস এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক এমিল হোকায়েমকে উদ্ধৃত করে জনাথন মার্কস বলছেন, ‘সিরিয়ায় যে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা শুধু যুদ্ধের পরিণতিতে হয়নি, শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট আসাদের কৌশলই ছিল কিছু কিছু এলাকা জনশূন্য করে ফেলা।’ হোকায়েম মনে করেন, বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে ‘অস্ত্র’ হিসাবে ব্যবহার করে সিরিয়া এবং রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর চাপ তৈরি করতে চেয়েছে। ফলে এখন যখন সিরিয়া এবং তুরস্ক মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধবিরতির জন্য পুতিনের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া এরদোয়ানের উপায় কি?

কিন্তু ইদলিবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে যে মীমাংসাই মস্কোতে হোক না কেন, তা কি টিকবে? জনাথন মার্কাস মনে করছেন সম্ভবত টিকবে না। কারণ তুরস্ক জানে ইদলিব নিয়ে তারা যদি পিছু হটে, তাহলে সিরিয়ায় অন্যান্য যে এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেগুলোতেও সিরিয়া আক্রমণ করতে পারে।

সেটি তুরস্কের সমস্যা, কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো রাশিয়া ঠিক কি চাইছে? এবং সেটা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে? সিরিয়ার সঙ্গে সাবেক রাশিয়ার সখ্যতা সাবেক সোভিয়েত সময় থেকেই। অনেক আগে সেখানে সোভিয়েত একটি নৌঘাঁটি ছিল। কিন্তু সিরিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের পর সেই নৌঘাঁটি এখন অনেক বড়ো এবং সেই সঙ্গে পুরদস্তুর একটি বিমান ঘাঁটি রাশিয়া তৈরি করেছে।

সিরিয়ার সঙ্গে যে রাশিয়ার সম্পর্ক শুধু ঐতিহাসিক তাই নয়, এটি এখন বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরিয়ার মাধ্যমে রাশিয়া এখন একটি বার্তা দিতে চাইছে— রাশিয়া কথা রাখে এবং বিশ্বস্ত বন্ধু। সিরিয়ায় তাদের এই ভূমিকার জন্য রাশিয়া এমনকী নেটো জোটের সদস্য তুরস্ককেও কাছে টানতে সমর্থ হয়েছে।

পশ্চিমাদের প্রতি বিরক্ত এরদোয়ান এমনকী রাশিয়ার এস৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যন্ত কিনেছেন। শাস্তিস্বরূপ আমেরিকা তুরস্ককে তাদের অত্যাধুনিক এফ৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি স্থগিত করে, যেটা রাশিয়ার জন্য সুবিধাই হয়েছে।

পশ্চিমারা রাশিয়ার ব্যাপারে কৌশল নিয়ে কালক্ষেপণ করতে পারে। কিন্তু তুরস্কের সেই সময় নেই। পশ্চিমাদের নিয়েও তিনি ভরসা হারিয়েছেন। ফলে পুতিনের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া এরদোয়ানের কাছে এই মুহূর্তে অন্য কোনো রাস্তা নেই।