ছিনতাই কেন কমে না

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২০, ২১:৫৩

ইহা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, গত এক যুগেও রাজধানীতে ছিনতাই-রাহাজানির লাগাম খুব বেশি টানিয়া ধরা সম্ভব হয় নাই। মানুষ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়িতেছে হাঁটিবার সময়, রিকশায়, বাসে কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলের সময়; সকালে-দুপুরে-সন্ধ্যায়; জনাকীর্ণ কিংবা ফাঁকা রাস্তায়। বিপদের কথা হইল, ছিনতাইকারীরা এখন শুধু লোকজনের টাকাপয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনাইয়া লইয়াই ক্ষান্ত হইতেছে না, অনেক ক্ষেত্রেই ছুরিকাঘাত করিতেছে, এমনকি গুলি করিতেও দ্বিধা করিতেছে না। সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত ছিনতাইসংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকা মহানগরীতে সবচাইতে বেশি ছিনতাই হয় শাহবাগ এলাকায়। এই এলাকার আটটি স্থানে তত্পর রহিয়াছে ছিনতাইকারী চক্র। গত আট বত্সরে শুধু শাহবাগেই ৮৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হইয়াছে। মামলার নথিপত্রে দেখা গিয়াছে, শাহবাগ মোড়, মত্স্য ভবন মোড়, প্রেসক্লাবের সম্মুখে, রেল ভবন, হাইকোর্ট মাজার মোড়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সম্মুখে, টিএসসি মোড় এবং বাংলা একাডেমির সম্মুখ-সড়কে অধিক ছিনতাই হইয়া থাকে। শাহবাগ শহরের ব্যস্ততম এলাকা। রাস্তাগুলি চওড়া, এইখান দিয়া সকল দিকে যাওয়া যায়। সেই কারণে ছিনতাই করিয়া সহজে পালাইয়া যাইবার সুযোগ থাকায় ছিনতাইও অধিক হয়। তবে ছিনতাইয়ের মামলার হিসাব দিয়া প্রকৃত ছিনতাইয়ের ঘটনা বুঝা যাইবে না। কারণ ছিনতাইয়ের শিকার হইয়াও অধিকাংশ মানুষই মামলা করে না।

ছিনতাই লইয়া এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হইতে পারিয়াছে, তাহার কারণ—ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা যত ঘটিতেছে, সেই তুলনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার, বিচার ও শাস্তির ঘটনা খুবই কম। পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব আন্তরিকভাবে তত্পর থাকিলে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়িবার প্রশ্নই উঠে না। ছিনতাই আটকাইতে মাঝেমধ্যে আমরা ক্রসফায়ারের সংবাদ পত্রিকায় দেখিয়া থাকি। শাহবাগ ছাড়াও কোনো কোনো এলাকায় দুষ্কৃতকারীরা ছিনতাইকর্মটি বহাল-তবিয়তে করিয়া যাইতেছেন, তাহা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা নহে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই উচ্চ প্রযুক্তির যুগে ছিনতাই প্রতিহত করা খুব কঠিন কাজ নহে। রাজধানীর বিভিন্ন ভবনে এবং সড়কে সিসিটিভি রহিয়াছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাহাদের কন্ট্রোলরুমে বসিয়াই খুব সহজে নজরদারি করিতে পারে ছিনতাইপ্রবণ অঞ্চলগুলি। ছিনতাইকারীরা যদি বুঝিতে পারে যে, তাহারা নজরদারির মধ্যে রহিয়াছে এবং ছিনতাই করিয়া পার পাওয়া যাইবে না, তাহা হইলেই কেবল ছিনতাইয়ের মতো দুষ্কর্ম হইতে তাহারা দূরে থাকিতে পারে।

ছিনতাইয়ের শিকার বেশির ভাগ মানুষই প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার শিকার হন। ইহার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। আহত বা নিহত হইবার ঘটনাও যেহেতু ঘটিয়া থাকে, সেই কারণে ছিনতাইকারীদের ব্যাপারে ২৪ ঘণ্টা ধরিয়া ৩৬৫ দিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ তত্পর থাকা দরকার। ছিনতাই দূর করিতে আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার এবং পর্নোগ্রাফির লাগামও টানিয়া ধরিতে হইবে। তাহা ছাড়া বেকারদের ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তা এবং কিশোর-তরুণদের সুশিক্ষা ও সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ করিয়া দেওয়া সম্ভব না হইলে সমাজ হইতে অপরাধ তথা ছিনতাই-রাহাজানি কখনো পুরাপুরি দূর করা সম্ভব হইবে না।