সুলতানার স্বপ্ন এবং প্রকৌশল শিক্ষায় নারী

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২০, ২১:৫৪

ফজলুর রহমান

 

শত বছরের পুরোনো এক রাজ্য। নারীশাসিত রাজ্য। এতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী বিজ্ঞানীরা প্রতিযোগিতায়  নেমেছেন। এক দল ইচ্ছেমতো বৃষ্টি ঝরায়। অন্য দলটি সৌরশক্তি জমিয়ে রেখে আলো জ্বালায়। এমন রাজ্যের অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। তবে আমরা এটি কল্পচিত্রে দেখি। যে চিত্রটি এেঁকছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত  হোসেন তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ।

আমরা দেখতে পাচ্ছি সুলতানাদের সেই স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছে দেশ। আলো থাকলে বিচ্ছুরণ ঘটবেই তা দেখিয়ে দিচ্ছেন নারীরা। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইউনেস্কো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিজ্ঞান শিক্ষায় অংশগ্রহণে বাংলাদেশের নারীরা সমতা অর্জন করেছে।’ এছাড়া রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বত্র নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে বর্তমান সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, কূটনীতি, সশস্ত্রবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী, শান্তিরক্ষা মিশনসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর সফল অংশগ্রহণ আমরা দেখছি।

শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের মেয়েশিশু ও কিশোরীদের যুক্ততা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। মেয়েশিশুদের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা ও বৃত্তি প্রদানের মতো সরকারি প্রণোদনা এবং সমাজে নারীশিক্ষার পক্ষে জনমত তৈরি হওয়া এর পেছনে বড়ো ভূমিকা রেখেছে। গবেষণার অপ্রতুল সুযোগ, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাধা ঠেলে নারীরা কাজ করছেন। কেউ কেউ পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে প্রকৌশল শিক্ষার বাইরে রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নতি সম্ভব নয়। তবে এখনো কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ কম। আমাদের দেশে মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। তবে সারাদেশেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারী প্রকৌশলীর সংখ্যাও বাড়ছে দ্রুত। পাশাপাশি বাড়ছে নারী প্রকৌশলীদের সামাজিক পদমর্যাদা।

মূলত সভ্যতার শুরু থেকে সকল উন্নয়ন ও অগ্রগতির অংশীদার হিসেবে সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীসমাজ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। উন্নয়নের সর্বস্তরে নারী-পুরুষর সমযার্দায় ও সম্মিলিত অংশগ্রহণে শান্তিময় দেশ তথা বিশ্ব গঠন সম্ভব হবে। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি স্পষ্টরূপে আছে। নারীর অধিকার এবং সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ ও নারীর প্রতি সকল  বৈষম্য দূরীকরণে প্রণয়ন করা হয়েছে বিভিন্ন নীতি, বিধিমালা ও কর্মপরিকল্পনা। আশা করি, নারী উন্নয়ন নীতি, কর্মপরিকল্পনা, আইন ও বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের ফলে নারীর সার্বিক সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজের সকলের সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

আবারও ‘সুলতানার স্বপ্ন’ প্রসঙ্গে আসি। বেগম রোকেয়া যখন এ লেখা লেখেন তখন ভারতবর্ষে বিমান দূরে থাক,  মোটর গাড়ি এসে থাকলেও তিনি দেখেননি। বিদ্যুত্শক্তি সম্পর্কেও তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা ছিল না। মেঘ  থেকে পানি ও সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহের চেষ্টা সেকালে বিজ্ঞানীরাও করছিলেন না। ওখানে এসেছে গোটা দেশকে একটি বৃহত্ বাগানে রূপ দেওয়ার আইডিয়া যখন আরবান-ফার্মিংয়ের নামও কেউ শোনেনি, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা অধুনা হলেও সেকালে বসেই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির কথা লিখেছেন তিনি। আমরা তো সেই রোকেয়ার ভূমিতেই আছি এখনো। আইনস্টাইনও বলেছিলেন, ‘কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান সীমাবদ্ধ, কল্পনা অসীম।’ আমাদের দেশে এখন নারীদের জ্ঞানের উত্কর্ষ চলছে। এরপর কল্পনা আর জ্ঞানের মিশেলে এক অনবদ্য বাস্তবতা নির্মাণ হতেই বা আর কতদূর! বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরিদের তা দেখিয়ে দেওয়ার পালা।

চট্টগ্রাম