একি, নারী দিবসে আমাকে ফুল দিচ্ছ যে?
যাতে সারাটা বছর মনে থাকে, নারী দ্য-বস।
/ সত্যজিত্ বিশ্বাস
অবিবাহিত, বিবাহিত, বিবাহত, ক্ষত-বিক্ষত অনেককেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সঠিক উত্তর দিতে পারেনি বেশিরভাগই। দেখি তো, আপনি পারেন কি না? বলুন তো, শোয়ার রুম মানে মাস্টার বেডের সাথে বাথরুম থাকে কেন? সঠিক উত্তর জানলে তো খুবই ভালো, যারা জানেন না উত্তরটা জানতে পরের প্যারায় আসুন।
ভাই রে, উত্তেজিত হবার কিছু নেই। যা ভাবছেন, তা না। স্বামী, স্ত্রীর বাকযুদ্ধের ঢাল হলো বাথরুম। নিজেকে বাঁচানোর নিরাপদ জোন। বাক্যবাণ নিক্ষেপ যুদ্ধে কে জিতল, কে হারল সেটা বোঝা যায় দৌড়ে ছুটে এসে, এতে কে আশ্রয় নেয় সেটা দেখে।
হেরে যাচ্ছেন, তীব্র বাক্যবাণে শরবিদ্ধ হয়ে কোনোভাবেই পেরে উঠছেন না? কিন্তু শরবিদ্ধ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লে তো আর বাঁচতে পারবেন না। বাথরুমে ঢুকে নিশ্চিন্ত মনে আধঘণ্টা জলের গান শুনুন। ব্যস, একদম নিরাপদ। আমি তো তাই করি। কী বললেন, বউ বাথরুমের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে, কিছু ছুঁড়ে মেরে ভাঙচুর শুরু করে কি না? আরে ভাই, আমাকে এত কাঁচা জিনিষ পেয়েছেন? বাসার প্রতিটি জিনিষ বউয়ের পছন্দে কেনা। আর যাই করুক, নিজের হাতে কেনা পছন্দের জিনিষ এনারা ভাঙচুর করেন না।
স্বামীরা তো আরো হিসেবি। উদাহরণ দিতে গেলে বাইরে যেতে হবে কেন? নিজের ঘটনাটাই বলি। একবার রাগে দিশেহারা হয়ে ভাবলাম, আজ আমাকে জিততেই হবে। হাতের কাছে অন্য কিছু না পেয়ে পেপার ওয়েট তুলে নিলাম। কী ভাঙ্গি, কী ভাঙ্গি করতে করতে এদিক ওদিক তাকিয়ে টিভিটাই চোখে পড়ল। হাতে থাকা পেপার ওয়েট নিয়ে টিভির দিকে এগুতেই হাত কাঁপা শুরু হয়ে গেলো। এত দামী জিনিষটা ভাঙ্গা যায়? ইতিমধ্যে গিন্নিও এসে হাজির। কোমরে হাত দিয়ে টিভি সিরিয়ালের নায়িকাদের ঢঙ্গে বলল, ‘কী হলো? থেমে গেলে যে?’
‘আমি থেমে যাওয়ার মানুষ নই’ বলে রাগে চোখ বন্ধ করে পেপার ওয়েট ছুঁড়ে মারলাম। না, না টিভির দিকে না, ফ্লোরে। তারপরের ঘটনা ইতিহাস। ফ্লোরের টাইলসের কিচ্ছু হয়নি। শুধু ডান পায়ের বুড়ো আঙুল ফুলে ঢোল। টানা দুই সপ্তাহ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছি। বুড়ো আঙুল এখনো নীল হয়ে আছে ঘটনার সাক্ষী হিসেবে।
এরপর থেকে কোনো জিনিষের উপর রাগ দেখানো ছেড়েই দিয়েছিলাম। হঠাত্ একদিন, কি যে হলো সেদিন...। অফিস থেকে ফিরে বউয়ের সাথে এমন লেগে গেলো যে, ইচ্ছে হচ্ছিল বাপের বাড়ি চলে যাই। রাগে ধরাম করে সদর দরজায় লাথি মেরে বের হয়ে পড়লাম। রাস্তায় বের হয়েই মনে পড়ল, বাপের বাড়ি তো কাছাকাছি কোথাও না। ময়মনসিংহের গৌরীপুর। এই ভর সন্ধ্যাবেলা এখন যাই কই?
অফিসে যে যাব সে উপায়ও নেই। সে তো পাঁচটার সময় বন্ধ হয়ে গেছে। আবার খুলবে কাল সকালে। যাকে দেখলে সব সময় সাইড দিয়ে সরে পড়ি, সিঁড়িতে দেখা হয়ে গেলো তার সাথেই। বাড়ির মালিকরা এমনিতেই সুবিধার হয় না। তাদের বউরা তো, আরো না। আমার বাড়ির মালিকের বউ যেন তাদের সকলের হেড মিস্ট্রেস।
সবসময় সবকিছুতে বুড়ির লম্বা নাক আর কান বাড়িয়ে দেবে। আমাকে দেখে ভুরু কুঁচকে বলল, কারোর উপর চড়া রাগ কি দরজার উপর মেটালে হবে? ‘না মানে দরজাটা ঠিক লাগছিল না’ বলে সরে যেতে চাইলাম। বুড়ি আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত শকুনি মার্কা চোখ দিয়ে স্ক্যান করে বললেন, ‘এই রাজবেশে ঘরের বাইরে কেন? বউমা কি ঘর থেকে বের করে দিয়েছে?’ ইচ্ছে হচ্ছিল বলি, তাতে তোর কী? ঠিক তখনই নিজের পোশাকের দিক খেয়াল হলো। আরে তাই তো, পরনে তো একটা আধ-ময়লা পাজামা, গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আর পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। এটা পড়ে বেশিদূর যাওয়াও তো সম্ভব না।
কোনো আত্মীয়ের বাসায় গেলে কেমন হয়—ভেবে পকেটে হাত ঢুকিয়েই শক্ত হয়ে গেলাম। তাড়াহুড়া করে বের হওয়ায় মানিব্যাগটাও নেওয়া হয়নি। হাতে শুধু মোবাইল ফোন। তাহলে এখন উপায়?
অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছি আর ভাবছি, ভাবছি আর হাঁটছি কাকে ফোন দেওয়া যায়? একটা ল্যাম্পপোস্ট দেখে তাতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল বের করে স্ক্রল করা শুরু করতেই প্রতিবেশী আনিস ভাই হাক ছেঁড়ে ডাকলেন, ‘কী ব্যাপার, এখানে দাঁড়িয়ে কেন? এখন তো স্কুল ছুটির সময় না।’
পাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমি যেখানে দাঁড়িয়েছি পাশেই মেয়েদের স্কুল। যে ল্যাম্পপোস্টে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছি, সেটা স্ট্রিট রোমিওদের দাঁড়িয়ে থাকার ঠেকনা হিসেবে কাজ করে। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে পড়ে আশ্রয় নিলাম অন্ধকার এক কোনে। পথচারীরা মনে হয় এখানে হালকা হতে আসে। গন্ধে মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠল। মশাগুলোও নতুন অতিথি পেয়ে ঘিরে ধরল যেন। হাত কি নাকে নেবো নাকি মশা মারার কাজে ব্যস্ত রাখব সে নিয়ে মেজাজ যখন চরমে তখনই মোবাইল ফোনটা পোঁ পোঁ করে ওঠল। ফোনে বউ হাঁক ছাড়ল, এই যে, চলে এসো। রান্না হয়ে গেছে।
মনে হলো, আকাশ থেকে যেন দৈববাণী এলো। গৃহপালিত পশুর মতো হাম্বা ডেকে বাসার দিকে রওনা দিলাম। বাসায় গিয়ে রুমে প্রবেশের পাপোষে পা মোছার সাথে সাথে কলুষিত মনটাও মুছে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম—বউ মানেই অপরাজিতা। তার সাথে জিততে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না! g
