/ জামসেদুর রহমান সজীব
মুরাদ ভাইকে আমরা সবাই স্বভাবকবি হিসেবেই জানি। বলা নেই কওয়া নেই, যে কোনো অবস্থাতেই তিনি কবিতা রচনা করে ফেলতে পারেন। তার এই প্রতিভায় আমাদের খুশি হবার কথা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কেবল বিব্রতবোধ করি। সেদিনকার এক ঘটনাই বলি। রমজান মামার দোকানে চা খেতে বসেছি। মুরাদ ভাই চায়ে চিনি খান না। রমজান মামা ভুল করে ভাইয়ের চায়ে চিনি দিয়ে ফেলেছেন। সেই চায়ে চুমুক দিয়ে মুরাদ ভাই তার মুখখানা বাংলার পাঁচ বানিয়ে ফেললেন। উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, ‘ওহে চাচা রমজান, কাড়িয়া নিবেন কি জান, চিনি খেয়ে পোড়ে প্রাণ, চা কিভাবে করিব পান!’ কবিতা শুনে রমজান চাচা সাময়িকভাবে হ্যাং খেলেন। আর আমরা মাথা চুলকে টাক ফেলার দশা করলাম।
এ তো গেলো ছোটখাটো ঘটনা। মুরাদ ভাইয়ের সাথে থাকলে এমন শত শত ঘটনার সাক্ষী হতে হয়। যখন সামনা-সামনি থাকেন না তখনও তার কবিয়ানা থেকে আমাদের নিস্তার নেই। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ হেন কোনো সামাজিকমাধ্যম নেই যেখানে তিনি বিচরণ করেন না। শুরু হয় ফেসবুক থেকে। তিনি ৪/৬ লাইনের একটা কবিতা লিখে পোস্ট করেন। তারপর সেই পোস্টের স্ক্রিনশট মেরে ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করেন। সর্বশেষ সেই স্ক্রিনশটটা আবার সবাইকে আলাদা আলাদা করে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। ঘটনা এখানেই শেষ হলে বাঁচা যেত। কিন্তু তিনি নজর রাখেন আমরা সবাই তার পোস্টে লাইক-কমেন্ট ঠিকঠাক করছি কিনা! আবার আমাদের ভেতর যারা বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর, তারা ঝঞ্ঝাট কমাতে একই কমেন্ট কপি-পেস্ট করে সর্বত্র। মুশকিল হয় তখন, যখন ভাই তার পোস্ট শেয়ার করতে বলেন। আমরা রীতিমতো বুকে পাথর রেখে তার কবিতা শেয়ার করি। আর এই কর্ম করার ফল যেটা দাঁড়িয়েছে তা হলো রোজ ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ৫/৬টা করে বন্ধু হারিয়ে যাচ্ছে। এই কষ্ট বুকে চেপে না রাখতে পেরে বন্ধু সবুজ একদিন বিষয়টা বলে বসলো মুরাদ ভাইকে। তিনি বেশ শান্ত গলায় আমাদের বোঝালেন, ‘এদেরকে চিনে রাখতে হবে। বিপদের সময় যারা পাশেই না থাকল, চলে গেলো, তারা আবার বন্ধু হয় কী করে!’
এসব করেই কোনোমতে দিন পার হচ্ছিল। কিন্তু একদিন বোমা ফাটানোর মতো একটা খবর নিয়ে হাজির হলেন মুরাদ ভাই। আমাদেরকে সমবেত করে ঘোষণা দিলেন আসন্ন বইমেলায় তিনি কবিতার বই বের করবেন। ফেসবুকেতার কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে কোনো এক প্রকাশক যেন মুরাদ ভাইকে কথা দিয়েছেন বই প্রকাশের। আর এতেই মুরাদ ভাই এক্সাইটেড হয়ে হার্টফেল হবার দশা। আমরাও পুরো বিষয়টা জেনে হার্টফেল করার দশাতেই। যেই অখাদ্য এতদিন ফ্রিতে গিলেছি, তা এবার কিনে গিলতে হবে ভেবেই বমি পেয়ে যায়। কিন্তু আমাদের অনুভূতিতে কার কী যায় আসে। মুরাদ ভাই জানালেন, বইয়ের নাম ঠিক করে ফেলেছেন, ‘আমার বুকের খাঁচাতে তুমি রবে মাস্তিতে’। প্রচ্ছদ দু-একদিনের ভেতর রেডি হয়ে যাবে। আমাদের কাজ হবে এলাকা, দেশ, বিদেশ, সৌরজগত্ পর্যন্ত বইয়ের প্রচারণা করা।
মান-ইজ্জত বগলদাবা করে বইয়ের প্রচারণা শুরু করি আমরা। অনলাইন স্যোসাল মাধ্যম তো বটেই, বাস্তব সমাজ থেকেও আমাদের উপহাস, তিরস্কার হজম করতে হলো। তবে মুরাদ ভাই আনন্দে গদগদ। বই বেরুবে তার, কবিতার বই। এই আনন্দ রাখার জায়গা ইহজগতে পাওয়া সম্ভব না। পত্র-পত্রিকায় বইয়ের বিজ্ঞাপন দিলেন তিনি। পত্রিকাওয়ালারাও বিজ্ঞাপন ছেপে পড়লেন বাটে! দু-তিন দিন পর তারাও বিজ্ঞাপন ছাপাতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। এইবার মুরাদ ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন বইয়ের প্রচারণার স্বার্থে ভিডিওচিত্র বানাবেন। কিন্তু ভিডিওচিত্রে অভিনয়ের জন্য কোনো মেয়ে মডেলই পাওয়া যায় না, কোনো মেয়েই রাজি হয় না। শেষে ছোটভাই পিয়ালকে জোরপূর্বক মেকআপ দিয়ে ড্রেস পড়িয়ে মেয়ে সাজানো হলো।
চিত্রনাট্য দাঁড় করানো হলো— পুকুরপাড়ে মেয়ে আনমনে বসে আছে। মুরাদ ভাই ফুল হাতে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যাবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে কবিতা আবৃত্তি হবে, ‘দেখলাম বসে আছো, ডিসিশন নিলাম পাশে যাবো, খোপায় ফুল ঠেসে দেবো, তারপর ছুটে পালাবো’! সবই ঠিকঠাক, পিয়াল গাইগুই করলেও দেখা গেলো মেয়ের চরিত্রে সে অস্কারজয়ী অভিনয় করে দেখাল। তবে ঝামেলা পাকলো মুরাদ ভাইকে নিয়ে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন যেন ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। হাঁটতে গিয়ে কয়েকবার করে উষ্ঠা খেলেন। পিয়ালের খোপায় ফুল গুজতে গিয়ে পরচুলাসুদ্ধ টেনে খুলে বসলেন! তারপরও বহু কাহিনি করে কাজটা শেষ করলাম আমরা।
সেই ভিডিওচিত্র আপলোড করে হলো আরেক মুশকিল। রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেলো। কিন্তু লোকে মেয়েটার ভূয়সী প্রশংসা করলেও মুরাদ ভাইকে সবাই হিজড়া সম্বোধন করে ব্যঙ্গ শুরু করল। আমাদের মাথায় কিছুই ঢুকল না। একটা আস্ত ছেলেকে মেকআপ দিয়ে মেয়ে বানালাম, লোকে তা ঘূণাক্ষরেও টের পেলো না। অথচ মুরাদ ভাই আহ্লাদ করে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিয়েছিল, তাতেই সবাই হায়হায় শুরু করে দিয়েছে। তবুও কপাল ভালো যে মুরাদ ভাই এসবে তেমন মাইন্ড করেননি। তার বক্তব্য, নাম্বার ওয়ান শাকিব খান ঠোটে লিপস্টিক দিয়ে এত জনপ্রিয়তা পেলে সে কেন ঠোঁটে লিপস্টিক দেবে না!
এভাবেই সময় পেরিয়ে গিয়ে বইমেলা চলে এলো। দুদিন পরেই বইমেলার উদ্বোধন। আর সেদিনই ভাইয়ের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে। আপাত দৃষ্টিতে এইটা নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ না থাকলেও মাসখানেক বইয়ের প্রচারণা করার কারণে আমরাও কেমন জানি খুব এক্সাইটেড। অবশেষে বইটা আসছে। কিন্তু যার বই তার মুখে হাসি নাই। দুশ্চিন্তায় চব্বিশ ঘণ্টা তিনি ঘামতে থাকেন। মুরাদ ভাইকে কারণ জিজ্ঞেস করে উত্তর না পেলেও আমরা তদন্ত করে আসল কাহিনি বের করে ফেলি। এক সপ্তাহ যাবত্ তিনি তার প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। মোবাইল নম্বর অফ, ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভেট। বই প্রকাশের জন্য মুরাদ ভাই প্রকাশককে হাজার ত্রিশেক টাকাও দিয়ে রেখেছেন। অথচ লোকটা পুরোপুরি গায়েব। আমাদেরকেও কিছু বলতে পারছেন না মুরাদ ভাই। আমরা নিজে থেকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, বইমেলা এসে গেছে তো। প্রকাশক দারুণ ব্যস্ত। মুরাদ ভাইয়ের সাথে তার কথা হয়েছে। খুব শীঘ্রই বইটা চলে আসবে।
মুরাদ ভাইয়ের সাথে সাথে আমরাও অপেক্ষা করতে থাকি। বইমেলা শুরু হয়। বইমেলা এগিয়ে যায়। এমনকি শেষ পর্যায়ে চলে আসে। আমরা কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাই না। মুরাদ ভাইয়ের সাথে যতবারই দেখা হয় তিনি হাসিমুখে জানান, ‘আসবে আসবে। কিছুদিনের মধ্যেই বইটা চলে আসবে।’ এই তো সেদিন, ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ। একে-তো লিপ ইয়ার, তার উপর বইমেলার শেষ দিন। আমরা সবাই বইমেলায় ঘুরঘুর করছি। হঠাত্ মুরাদ ভাইয়ের সাথে দেখা। আমাদের সবার চোখই কেন জানি পানিতে ছলছল করে উঠল। মুরাদ ভাই এগিয়ে এসে হাসিমুখ করে জানালেন, ‘বুঝলি, এবারকার মেলাটা তেমন জমেনি। প্রকাশক তাই বইটা এবার বের করলেন না। সামনের বছর বের করবেন আশা করা যায়। তোরা কিন্তু হতাশ হবি না। একটা বছর হাতে এলো আমাদের, আমরা সারাবছর বইয়ের প্রচারণা চালাব!’ ভাইয়ের কথা শুনে আমরা ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করলাম। এই কান্নার কারণ ভাইয়ের বই প্রকাশ না হওয়ার দুঃখে নাকি অন্যকিছুতে, তা কেউই বুঝতে পারলাম না। g
