গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। চারিদিকে চোখে পড়ে মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। তবে দুঃখজনকভাবে এই সকল প্রযুক্তিপণ্যের একটি বড়ো অংশ নকল ও অবৈধ। বাংলাদেশ বিপুল জনসংখ্যার নিম্ন-মধ্যম আয়ের একটি দেশ, এইখানে ভোক্তারা বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করিতে যাইয়া নিয়মিত নকল পণ্যের দ্বারা প্রতারিত হইয়া থাকেন। তবে ইহার সহিত দেশের গড় মানুষের নীতি-নৈতিকতার সম্পর্কও জড়িত। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নকল পণ্যের অসাধু কারবারের সহিত জড়িত। জানা গিয়াছে, দেশে নকল ও অবৈধ মোবাইল ফোনসেটের বাজার ৪ হাজার কোটি টাকার। এই নকল ও অবৈধ ব্যবসা রোধে বিটিআরসি বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করিয়া থাকে, পাশাপাশি বৈধ আমদানিকারকদের সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণাও রহিয়াছে কিন্তু কোনোভাবেই অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য থামানো যাইতেছে না। ইহার ফলে ক্রেতারা একদিকে যেমন নিম্নমানের মোবাইল ফোনসেট ক্রয় করিয়া প্রতারিত হইতেছেন, অপরদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হইতে বঞ্চিত হইতেছে। এই রাজস্বের পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে দেশে যেই সকল উদ্যোক্তা বড়ো অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করিয়াছেন হ্যান্ডসেট তৈরির কারখানা স্থাপনে তাহারা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন। সরকারের টেলিযোগাযোগ সংস্থার নীতির দুর্বলতার কারণে এই অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হইতেছে না বলিয়া অনেকে মনে করিয়া থাকেন।
বর্তমানে স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। আর এই সুযোগে বাজারে ছড়াইয়া পড়িতেছে বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্যান্ডের স্মার্টফোনের আদলে তৈরি ক্লোন স্মার্টফোন। এই সকল ক্ষেত্রে ক্রেতার নিজেরও সচেতন হইবার প্রয়োজন রহিয়াছে। ফোন ক্রয়ের পূর্বে ক্রেতা পণ্যের আইএমইআই বা ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি কোড পরীক্ষা করিয়া ইহা আসল কি না তাহা যাচাই করিতে পারেন। প্রতিটি ফোনের একটি স্বতন্ত্র আইএমইআই কোড আছে যাহার মাধ্যমে ফোনের ব্যান্ড, মডেল নাম্বার, অবমুক্তির তারিখ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। পাশাপাশি নকল হ্যান্ডসেট বাজারে আসা বন্ধ করিতে বিটিআরসি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করিয়াছে। ইহা স্থাপিত হইলে অবৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেটে সিমকার্ড সচল হইবে না বলিয়া প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জানাইয়া থাকেন। বিষয়টি আরো পরিচ্ছন্ন ও নিশ্চিত করিতে যত দ্রুত সম্ভব সিমকার্ডের মতো হ্যান্ডসেটের এই রেজিস্ট্রেশন এনইআইআর চালু হউক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কিছু নিয়মও আমরা অনুসরণ করিতে পারি; যেমন হ্যান্ডসেটের বক্সে পণ্যের ব্রান্ড মূল্য দেখানো বাধ্যতামূলক করা যাইতে পারে। ইহার ফলে কম মূল্য দেখাইয়া কর ফাঁকি দেওয়া বন্ধ হইবে। সার্বিকভাবে জনগণকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাইতে, অপরাধঝুঁকি কমাইতে এবং সরকারের ন্যায্য রাজস্ব আদায়ে এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।
