প্রতিটা দিনই হোক সমতার

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২০, ২১:৪৪

 

সুমনা মৃধা

নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নকে অনেকেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারা নারীর স্বাধীনতাকে পরিধেয় পোশাকের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করে ফেলেন। আমার মতে, নারী অধিকার হলো যথোপযুক্ত সম্মানসহকারে নারীর মতো করেই মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার। নারী অধিকার বলতে কখনোই আমি এটা বুঝি না যে পুরুষের মতো করে জীবন যাপনের অধিকার। নারী-পুরুষ সম-অধিকার মানে এই নয় যে একজন নারীকেও পুরুষের বেশভূষা ও চালচলন অনুসরণ করতে হবে। একজন পুরুষ যা করে, তা-ই অনুসরণ করে পুরুষের ছাঁচে ফেলে নিজেকে গড়তে চাওয়ার প্রবণতা সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং পুরুষের অনুসারীরূপে নিজেকে গড়ে তোলা। একজন নারী সেই বৈশিষ্ট্যে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রদর্শন করবে, যা সে নিজের মধ্যে ধারণ করে। নারীর সম-অধিকার হলো প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর নিজস্ব স্বকীয়তায় গর্বিত পদচারণা। নারী টিকে থাকবে তার নিজের সত্তায় আর পুরুষ বাঁচবে পুরুষের সত্তায়। ‘আমি মানুষ’ কথাটা বলতে আমি যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তার থেকে বেশি গর্ববোধ করি ‘আমি নারী’ কথাটার গৌরবে।    

আন্তর্জাতিকভাবে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হলো জাতীয়, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সমতা নিশ্চিত করা। তবে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিতের সূতিকাগার হলো পরিবার। নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দেওয়ার চর্চাটা শরু করতে হবে পরিবার থেকেই। ‘নারী’ শব্দের মাহাত্ম্য উপলব্ধি ও নারীকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষাটিও পরিবারকে নিশ্চিত করতে হবে। পুত্রসন্তানের পাশাপাশি কন্যাসন্তানকেও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।            

আশার কথা হলো, বর্তমান সমাজে প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাকশিল্পের উন্নতিতে সিংহভাগ অবদান নারীর। কর্মজীবী মানুষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ  নারী। মাঠে ফসল ফলানো থেকে শুরু করে দেশ চালানোর মতো মহান দায়িত্ব অনায়াসেই বয়ে বেড়াচ্ছে নারীরা। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলেও নিশ্চিত করা যায়নি নিরাপত্তা ও সমতা। নারীরা নানাভাবে যৌন নিপীড়নসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের নিমিত্তে গণপরিবহন ব্যবহারকালীন শিকার হচ্ছে ধর্ষণের। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নেই নারীর নিরাপত্তা। গত এপ্রিলে সোনাগাজীতে মাদ্রাসার ছাদে আগুনে পুড়িয়ে নুসরাতের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এর নিকৃষ্ট উদাহরণ। নারীরা যেন আজ স্বদেশেই পরবাসী! 

বাল্যবিবাহের কারণে অকালেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ছে অসংখ্য মেধাবী নারী। এভাবে নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে না। সেই সঙ্গে ব্যাহত হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রসমূহের সমন্বয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত একটি টেকসই বৈশ্বিক রূপান্তরের উদ্দেশ্যে ১৭টি লক্ষ্য চিহ্নিত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গৃহীত হয়। এসডিজির অভীষ্ট-৫-এ বলা হয়েছে নারী ও কন্যাশিশুর সমতা অর্জন ও নারীর ক্ষমতায়নের কথা। নারীর ক্ষমতায়নকে এখানে জোর দেওয়া হয়েছে। যদি যথাসময়ে নারীর সম-অধিকার ও সমতা বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই যেখানে নারী, সেখানে নারীর সমতা নিশ্চিত না করে শুধু পুরুষের জয়গানে সাফল্য পেতে চাওয়া কেবল পণ্ডশ্রম বলেই পরিগণিত হবে।

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৮ মার্চ একটি বিশেষ দিন। ব্যাপক ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি উদ্যাপিত হবে বলেই জানি। মিছিল-সমাবেশে বক্তার মুখে ফেনা উঠবে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার জয়জয়কারে। তার পরদিনই হয়তো নিজেই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে নারীর পথচলা, তার হাতেই হয়তো নারী হবে নির্যাতিত। নারী দিবস উপলক্ষ্যে যে ছেলেটি নারীর বন্দনাগীতিতে মুখরিত করে তুলবে তার ফেসবুক ওয়াল, সেই ছেলেকেই দেখা যাবে কোনো নারী তারকার ছবিতে বা পোস্টে আক্রমণাত্মক, অশ্লীল গালাগালিপূর্ণ  ও অসংবেদনশীল কমেন্ট করতে কিংবা ইনবক্সে আপত্তিকর মেসেজ, ছবি বা ভিডিও ক্লিপ পাঠাতে। দেখা যাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতে।

 আমাদের সমাজের নারীদের নিরাপত্তাবিধানের দায়ভার কার? অবশ্যই আমাদের প্রত্যেকের। মনে রাখতে হবে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আমরা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নারীর জন্য বিশেষ একটি দিন নয়, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল বিশেষ একটি দিনে নয়, নারীকে ভালোবেসে দুই লাইন লেখা বিশেষ কোনো একটি উপলক্ষ্যে নয়, বিশেষ একটি দিনে জনতার স্রোতে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতা নিশ্চিতের নিছক বুলি আওরানো নয়। বরং প্রতিটা দিন হোক নারীর, প্রতিটা দিন হোক পুরুষের, প্রতিটা দিন হোক মানুষের, প্রতিটা দিন হোক সমতার।      

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়