বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলেও মোকাবিলার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই। কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা বললেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবার সঙ্গে জড়িত চিকিত্সক-নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কেউ যেন সংক্রমিত না হন, সেজন্য তাদের প্রত্যেকের জন্য পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবহার অত্যাবশ্যক। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ পিপিই মজুত রয়েছে তা খুবই সীমিত। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে ডাক্তার-নার্সদের নিরাপত্তাসামগ্রীর সংকট রয়েছে। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে দুটি থার্মাল স্ক্যানার নষ্ট। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেটে চারটি অকেজো। এগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপনের জন্য শুধু চিঠি চালাচালি হচ্ছে। ডাক্তাররা বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ডাক্তার-নার্সরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম ঝুঁকিতে পড়বেন। প্রতিদিন নতুন নতুন দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। আমেরিকার মতো দেশও স্বীকার করেছে, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে তাদের পর্যাপ্ত সামগ্রী নেই। সেখানে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে একটি জিনিসের জন্য কেবলই চিঠি চালাচালি অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেন ডাক্তাররা।
সম্প্রতি পশু হাসপাতাল থেকে নিরাপত্তা গাউন এনে তা পরিধান করে সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সকরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে এক রোগীকে সেবা প্রদান করেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সব হাসপাতালে নিরাপত্তা গাউন মজুত রাখতে হবে। কারণ কখন কোথায় কে আক্রান্ত হবে কেউ বলতে পারবে না।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, সিলেটের ঐ রোগী যেখানে ছিল সেখানে গাউন ছিল না। তবে পশু হাসপাতাল নয়, জেলা সদর হাসপাতাল থেকে গাউন নিয়ে সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সকরা সেবা দেন। তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগী কোথাও পাওয়া যায়নি। তাই সব জায়গায় নিরাপত্তা গাউন পাঠানো হয়নি। তবে এখন গাউন পাঠিয়েছি। যখন যেখানে প্রয়োজন সেখানে পাঠানো হবে।
করোনা ভাইরাস ব্যাপক হারে ছড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাকে মাথায় রেখে দেশীয় একটি কোম্পানির মাধ্যমেই উন্নত মানের পিপিই উত্পাদনের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছেও পিপিইর চাহিদা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে করোনা ভাইরাস ব্যাপক হারে সংক্রমিত না হলে মজুত থাকা পিপিই দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। তবে ব্যাপক হারে সংক্রমণের ক্ষেত্রে আরো অনেক পিপিই লাগবে। কারণ সার্বক্ষণিক ফেসমাস্ক, চশমা আর সুরক্ষিত পোশাকসহ নানা কিছু দিয়ে শরীর মুড়িয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে হয়।
রোগতত্ত্ববিদরা বলেন, বিশ্বের বহু দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে দ্রুত পিপিই পাওয়া অনিশ্চিত হতে পারে। কারণ যেসব দেশে আগেই কভিড-১৯ সংক্রমিত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত ও মারা যাচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে তাদের অগ্রাধিকার বেশি। এসব চিন্তাভাবনা থেকেই দেশীয় একটি কোম্পানির মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে পিপিই প্রস্তুত করতে হবে। আর এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
এদিকে নিজেদের সুরক্ষা সামগ্রীর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে ডাক্তার-নার্সদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলেন, সুরক্ষাসামগ্রী পর্যাপ্ত না থাকলে এবং করোনা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
জনসাবধানতাই পারে করোনা প্রতিরোধ করতে :আইইডিসিআর
বাংলাদেশেও যে কোনো সময় করোনার সংক্রমণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শনিবার দুপুরে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে করোনা ভাইরাস নিয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি আরো বলেন, দেশে ১১১ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে, কারো শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। যারা করোনা ভাইরাস আক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন এবং করোনার উপসর্গ রয়েছে, তাদেরকে গণপরিবহন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া যাদের শ্বাসকষ্ট রয়েছে, তাদের হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করার পরামর্শও দেওয়া হয়।
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, জনসাবধানতাই পারে করোনা প্রতিরোধ করতে। তাই লক্ষণ উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে বসে না থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যে কোনো সময় করোনা-আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হতে পারে। তাই সব সময় প্রস্তুত থাকতে চাই। বর্তমানে তিন জন আইসোলেশনে আছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, ইতালির অবস্থা উদ্বেগজনক। দূতাবাসের মাধ্যমে আক্রান্ত দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ইতালিতে করোনা আক্রান্ত বাংলাদেশি হোম কোয়ারান্টাইনে আছেন। বাংলাদেশসহ সাতটি দেশে ফ্লাইট বন্ধের বিষয়ে কুয়েতের সিদ্ধান্ত নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।
