কালো কয়লায় বাঁধা জীবন

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২০, ১৯:১৫

তপন কুমার দাস

 

৩ বছর আগে জাদুকাটা নদীর পাথর কোয়ারিতে কিশোরী হাদিসার দেখা পেয়েছিলাম। পাথর উত্তোলনের কাজ করছিল। সঙ্গে ছিল ৬ বছরের ছোট বোন লাভিয়াও। সম্প্রতি জাদুকাটায় গিয়ে আবারও তাকে খুঁজতে থাকি। পাইনি, মাঝখানে কোয়ারিগুলো বন্ধ হওয়ায় এরা অন্যত্র চলে গেছে। তাকে না পেলেও তার বয়সী অসংখ্য শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী ও পুরুষকে পেয়েছি।

তবে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। বালুর সঙ্গে মিশে থাকা কুড়ানো কয়লায় যাদের জীবনের চাকা ঘোরে। এতে হয়তো কারও ভাগ্য ফেরে, কারও বৃত্তে ঘুরেই বাকি দিন পেরিয়ে যায়।

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার হাওর ও জাদুকাটা নদীতে এ রকম কিশোর-কিশোরী এবং নারীর দেখা মিলবে সবসময়। ১২-১৩ বছর বয়সেই, কিংবা তারও আগেই খেলার সামগ্রী আর বইখাতা ছেড়ে সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে এই শিশুদের। হাওর এলাকায় বেড়েছে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়ও যুক্ত হচ্ছে শিশুরা।

কঠিন-রুক্ষ এক জীবনে শৈশবেই পা রাখতে হয়েছে তাদের। সংসারের দায় মেটাতে নামতে হয়েছে কঠিনতম কাজে। রাত-দিন পরিশ্রম করেও আর্থিক সচ্ছলতার হদিস পায় না এরা। অভাব-অনটন তাদের যাপিত জীবনের নিত্যসঙ্গী। এ রকম দুই সহোদর মুখলেছ ও মুসতাকিন। মুখলেছের বয়স বড়জোর ১০। ছোট ভাইয়ের বয়সও বড়জোর ৮ কিংবা ৯ হতে পারে। তাহিরপুরের জাদুকাটা নদীর অদূরের বড়গোপ টিলা (বারেক টিলা) এলাকায় বাড়ি।

সম্প্রতি কথা হয় মুখলেছের সঙ্গে। মুখলেছের কথায়, ‘বাবা মাঝে মাঝে কামে (কাজে) যায়। পরিবার চলে না। তাই কয়লা কুড়াই। মাটির নিচ থেকে কুপাইয়া কুপাইয়া (খুঁড়ে খুঁড়ে)। জি কষ্ট (যে কষ্ট) কয়লা তুলা।’ এক বস্তা ৫শ’ টাকার মতো বিক্রি হয়। 

পাশেই কাজ করছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী জরিনা। মুখলেছ ও মুসতাকিন তার মেয়ের পক্ষের নাতি। জরিনা বলেন, ‘আমরার কষ্ট শেষ হয় না বাবা। মাটির নিচ থেকে কোদাল দিয়া কুপাইয়া তুলি। এরপর কড়ি (মাটি) পালাইয়া কয়লা পাই। তিন-চারদিনে এক বস্তা হয় কষ্ট করে। আগে দাম পাওয়া যাইত। এখন ৩শ থেকে ৪শ টাকার মতো পাওয়া যায়।’ 

জরিনার মেয়ের পক্ষের নাতি মুখলেছ স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখা করে শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা তার। জারিনা জানালেন, নাতি বিদেশও যাইতে পারে, আবার নছিবে যা আছে (অর্থাত্ কপালে যা লেখা আছে মুখলেছের) তা হবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাদুকাটা পাড়ের মানুষজন নদীতে পাথর ও কয়লা কুড়িয়ে তাদের জীবিকানির্বাহ করে। সুনামগঞ্জে সীমান্তঘেঁষা নদী জাদুকাটায় বালুর সঙ্গে মিশে থাকা কয়লা কুড়িয়ে ভাগ্য ফিরছে অনেকের। আবার অনেকে আর্থিক সচ্ছলতার হদিসও পায় না। শুধু জীবিকার জন্য সংগ্রাম করে। শুধু সীমান্ত নদী জাদুকাটাই নয়, পাশাপাশি সীমান্তের বেশ কয়েকটি ছড়া থেকেও কয়লা কুড়িয়ে জীবিকানির্বাহ করেন অনেকে। এরমধ্যে প্রায় দেড়সহস্রাধিক নারী ও শিশু রয়েছেন। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের জনপদ তাহিরপুর। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ঘেঁষা সীমান্ত লাগোয়া এ জনপদের বেশিরভাগ মানুষই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত। প্রতিবছর বর্ষায় ভারত থেকে প্রবাহিত স্রোতধারায় জাদুকাটা ও সীমান্ত ছড়াগুলো দিয়ে বালুর সঙ্গে মিশে থাকা কয়লা বাংলাদেশে আসে। এরপর বালু খুঁড়ে বালু মিশ্রিত কয়লা প্রথমে ঠেলা জালে তোলা হয়। পানিতে ছেঁকে বালু থেকে আলাদা করা হয় কয়লা। এরপর এগুলো বস্তায় ভরে রাখেন তারা। প্রতি বস্তা কয়লা সাড়ে ৩ থেকে ৪শ’ টাকা করে স্থানীয় কয়লা মহাজনরা তাদের কাছে থেকে কিনে নেয়। তাহিরপুর ছাড়াও বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ জাদুকাটা নদীতে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু কয়লা কুড়ানোর কাজে নিয়োজিত থাকেন।

আবার নদীতে কয়লা না পেলে অনেকে জীবিকার অন্বেষণে জায়গা বদল করে। কিন্তু সংগ্রাম শেষ হয় না। তাদের দুঃখের সীমানা আরও দীর্ঘ হয়। হাদিসার মতো পরের বছর হয়তো মুখলেছ ও জরিনাকে পাওয়া যাবে না একই স্থানে। জীবিকার তাগিদে তারা নতুন জায়গা বেছে নেবে। স্থান বদল হলেও থামবে না জীবিকার সংগ্রাম। দারিদ্র্য পীড়িত মানুষগুলোকে শ্রমজীবনের বাস্তবতা এভাবেই তাড়া করে ফেরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়।