করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২০, ২১:৫৩

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

নোভেল করোনা শুরু হয়েছিল প্রথমে চীনে; কিন্তু মাত্র ৪৫ দিনে ছড়িয়ে গেছে গোটা বিশ্বে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কার্যত এর মোকাবিলার ব্যাপারে পরামর্শ দিতে হাত ধুয়ে নিয়েছে। এই সংস্থা মনে করে করোনা ভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবী এখন এক ‘অজ্ঞাত বিপদের মুখে’—এমনটাই জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থার প্রধান টেডরস অ্যাডানম গোব্রিয়েসাস বলেছেন—এই ভাইরাস চরিত্রে অনেকটাই আলাদা ঠিকই, কিন্তু ঠিকমতো পদক্ষেপ নিলে একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার কাথায়—‘আমরা এই ভাইরাসকে হারাতে পারব।’ তবে তার মতে, রোগের থেকেও এই ভাইরাস নিয়ে যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সেটাই বেশি মারাত্মক। করোনা নিয়ন্ত্রণে হোয়াইট হাউজে যে টাস্কফোর্স তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত সীমা বর্মণ। আমেরিকার ১৫টি প্রদেশে এখন ১০০ জনেরও বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে দাবি। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান মনে করছেন, কভিড-১৯ ওয়ানওয়ে স্ট্রট নয়। যদি বিশ্বের সব দেশ দ্রুততার সঙ্গে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

করোনার ব্যাপারে ভারতও পিছিয়ে নেই। বুধবার পর্যন্ত ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ছয়। বৃহস্পতিবার এক ধাপে ৩০ জনের আক্রান্ত হবার খবর দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদি ও তার মন্ত্রিসভার অনেক মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, ৯ মার্চ হোলি উত্সবে তারা যোগ দেবেন না। ভারত সরকারের আরো সুপারিশ—প্রয়োজন না হলে দেশের বাইরে যাবেন না। ভারতে আগত সমস্ত যাত্রীকেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আলাদা করে রেখে পরীক্ষা করা হয়। করোনা আক্রান্ত রেল-যাত্রীদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার চীনসহ দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-ইরাক প্রভৃতি দেশে ভ্রমণ করা প্রায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ভারতের জাতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে জনগণকে সতর্ক করে দেবার জন্য বিশিষ্ট চিকিত্সকদের সাক্ষাত্কার দেখানো শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। দেশের বিশিষ্ট চিকিত্সক ড. করণ মেধার উপদেশ হলো—১. কারো হাঁচি-কাশি হলে ফুট তিনেক দূরত্ব রাখুন, ২. সর্দি-কাশি হওয়া ব্যক্তির জিনিস আলাদা রাখুন, ৩. সর্দি-কাশিতে ভুগলে প্রচুর জল খান, ৪. সর্দি-কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, প্রবল জ্বরে দ্রুত ডাক্তার দেখান, প্রয়োজনে পুরো পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান, ৫. আক্রান্তের লালা থাকতে পারে নানা জায়গায়। তাই বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার সঙ্গে রাখুন বাইরে গেলে, ৬. সুসিদ্ধ ও ভালোভাবে রান্না করা খাবার খান।

সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী বিশ্বের একশ্রেণির বিশেষজ্ঞ মনে করেন, করোনা ভাইরাস এমন একটা সংক্রমণ তৈরি করবে, যা কখনোই নির্মূল হবে না, বিশেষ বিশেষ সময় এর প্রকোপ বাড়বে। সাধারণত ফ্লু, ঠান্ডা লাগা বা বুকে সংক্রমণের মতোই। বিশ্বে এখন চীনের পরে দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৫ হাজার ছুঁয়ে গেছে। আর মৃতের সংখ্যা ছুঁয়েছে ২৮। বিশ্ব জুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে জি-৭-ভুক্ত দেশগুলোর সব আর্থিক নীতিনির্ধারক প্রধানেরা এক বৈঠক করেছেন। করোনা ত্রাসের ছাপ পড়েছে বিশ্ববাজারেও। পশ্চিম এশিয়ার আতঙ্ক বাড়াচ্ছে ইরানও। বাহরাইন ও কুয়েত থেকেও নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। তেহরান ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তাদের দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি টিভিতে বলেছেন, ‘সংক্রমণ রুখতে প্রশাসনের সব নির্দেশ মেনে চলুন, হাত-মুখ পরিষ্কার রাখুন।’ সেখানকার উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে মৃতের সংখ্যা ছুঁয়েছে ৭৭, চীনের পরে যা সবচেয়ে বেশি।

উদ্বেগের মাত্রা যতই বাড়ছে ততই নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। কথা ছিল, ১০ থেকে ১২ মার্চ বিশ্বের জনপ্রিয় বইমেলা হবে লন্ডনে। ব্রিটিশ সরকার তাও বাতিল করে দিয়েছেন। এই লেখা পর্যন্ত বিশ্বে এই করোনা আক্রান্তের ফলে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৫ জনের আর আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখেরও বেশি। বিশ্বব্যাংকও পিছিয়ে নেই। বিশ্বব্যাংক ঘোষণা করেছে— উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার সাহায্য দেবে। আর ইরান ঘোষণা করেছে সংক্রমণ ঠেকাতে ৫ হাজার ৪০০ বন্দিকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেবে। ইরানের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে জুমাবারে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াও প্রশাসনকে বন্ধ রাখতে হয়েছে। সংক্রমণের ভয়ে মক্কা-মদিনা যাত্রাতেও সৌদি আরব সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে বিশ্ববাণিজ্যও প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা খেয়েছে। ধাক্কা খেয়েছে পর্যটনশিল্প। এই বসন্তের মৌসুমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার পর্যটক প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়তেন। সেই সঙ্গে মার খেয়েছে হোটেল ব্যবসায়। ওষুধশিল্পও সংকটের মুখে। ফলে ওষুধের দাম এক লাফে বেড়ে গেছে পাঁচ গুণ আর অত্যাবশ্যক ওষুধও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ওষুধ তৈরির যেসব যন্ত্রপাতি চীন থেকে আসত, সেইসব যন্ত্রপাতি বোঝাই জাহাজ বিভিন্ন জায়গায় সমুদ্রে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্রিকেটসহ যেসব খেলাধুলা চলছিল, তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যাবে তার কোনো হদিস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিতে পারছে না।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতে এবং পূর্ব বাংলায় একটি সাংঘাতিক সংক্রামক রোগ এসেছিল। যার নাম দেওয়া হয়েছিল কনজাইভেটিস আর বাংলায় বলা হতো জয় বাংলা। এখানে তখনকার চিকিত্সকরা এই রোগ নির্ণয়ের জন্য একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। সেটি হলো এই—সারা দিন চোখে অন্তত ১০ বার জলের ঝাপটা ও নুন গরম করে কাপড়ের পুঁটলি করে চোখে সেক দেওয়া এই জন্য আর কোনো ওষুধ চোখে দিতে হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররা মুক্তিবাহিনীর মধ্যেও চোখের এই রোগ সারাবার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করেছিলেন।

এছাড়াও পর্যটনশিল্পের ওপর এর আগেও একটি বড়ো আঘাত এসেছিল। সেটি হলো গত বছর ৫ আগস্ট ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫-এর ‘ক’-এর অবলুপ্তির ফলে জম্মু-কাশ্মীরের পর্যটনশিল্পের যে দফারফা হয়েছে সে কথা ভারত সরকার সম্প্রতি সংসদে একটি প্রশ্নের লিখিত জবাবে জানিয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে বাঙালির উত্সাহের শেষ নেই কিন্তু শুধু বাঙালিরাই নয়, সে রাজ্যে বেড়াতে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন যে কোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষই। গত বছর পুলওয়ামায় জঙ্গি আক্রমণের পর থেকেই নতুন করে ফিরে এসেছিল আতঙ্ক। কিন্তু সেই মেঘ কাটতে শুরু করার আগেই ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির পথে হাঁটে কেন্দ্র। নতুন করে কোনো সংকট হতে পারে, সেই আশঙ্কায় পর্যটকশূন্য করে দেওয়া হয় কাশ্মীর।

যদিও এই ব্যবস্থা ছিল সাময়িক। কিন্তু পরে আবার যখন ভূস্বর্গের জনজীবন স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন আর পর্যটনে সেভাবে সাড়া পাওয়া যায় না। তা জানাচ্ছে খোদ পর্যটন মন্ত্রকই। তারা হিসাব পেশ করে বলেছে, গত আগস্ট মাসে সে রাজ্যে পর্যটক গিয়েছিলেন মাত্র ১০ হাজার ১৩০ জন। কিন্তু ঠিক আগের বছরই সেই একই মাসে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার ১৩৪ জন। একইভাবে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ৪ হাজার ৫৬২ জন। এভাবে পর্যটনশিল্প তলানিতে এসে ঠেকলে ভারতের অর্থনীতির কী অবস্থা হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি শীতকালে বিদেশে পর্যটকদের ভিড় হবে কাশ্মীরে তারাও আর আসছে না।

করোনা থেকে বিশ্ব কবে মুক্ত হবে তা বলা যাচ্ছে না। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে যেসব বিমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় যেত সেই বিমানগুলো এখন প্রায় খালি। যাত্রী আসা-যাওয়া নেই বললেই চলে। এমনিতেই বিমান ব্যবসায় ধুঁকছে। তার ওপর আবার এই সংকট। এবার আসি  আপামর বাঙালির একটি নিত্য লোভনীয় খাদ্যের ব্যাপারে। সেটি হলো মুরগি। মুরগি ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়েছে। বিক্রেতারা শূন্য হাতে বসে আছে। এখন আবার তারা ক্রেতা টানার জন্য মুরগির সঙ্গে ফ্রিতে পেঁয়াজও দিচ্ছে। যা-ই হোক, খেলাধুলা বেড়ানো, খাওয়াদাওয়া, সবই শিকেয় উঠেছে।

n লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক