মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২০, ২১:৫৩

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার ও অপব্যবহারের কারণে সারা বিশ্বে আজ বহুবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমাদের দেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, কিন্তু কোনোভাবেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে বাংলাদেশে মাদক একটি অন্যতম সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। মাদক দেশের উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। মাদকাসক্তি দেশের প্রাণশক্তি যুবসমাজকে ধ্বংসের মাধ্যমে উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। মাদক শুধু ব্যক্তিজীবনকে ধ্বংস করে না বরং ধ্বংস করে গোটা পরিবারকে, তৈরি করে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, সেই সঙ্গে কলুষিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে। মাদকাসক্তির বৃদ্ধির কারণে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ রাষ্ট্রের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষত, আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ যুবসমাজের একটি বিরাট অংশ বর্তমানে মাদকের ঝুঁকিতে আছে। একটা ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নির্ভর করে তার রাসায়নিক গঠন-বৈশিষ্ট্যের ওপর। এই ড্রাগ অপব্যবহারের কারণে রোগী তার রোগের জন্য ওষুধের গুণাগুণ পাওয়ার বদলে হয়ে যায় বিষ। তাই অনেক সময় বিষ স্বল্প মাত্রায় প্রয়োগ করলে হয় ওষুধ, কিন্তু বেশি মাত্রা বা অযথা গ্রহণ করলে হয় বিষাক্ত, যা শরীরকে নিস্তেজ করে, মৃত্যু ডেকে আনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অপব্যবহারের মাধ্যমে মাদকাসক্তির সূচনা হয়।

গত কয়েক দিন আগে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী-সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তি থেকে যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সমাজ এ অসুস্থতা দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যুবসমাজ আজ নানাভাবে বিপথগামী হচ্ছে। তাদের যদি আমরা ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় রাখতে পারি, তাহলে দেশ থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারব। সেদিকে লক্ষ রেখেই খেলাধুলা ও সাংস্কৃতির ওপর আরো সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরো বলেছেন, জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস বা মাদকাসক্তি—এগুলো মানুষের মনমানসিকতা ও স্বাস্থ্য নষ্ট করে দিচ্ছে, সমাজকে কলুষিত করে দিচ্ছে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছেলেমেয়েদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণ এবং দেশপ্রেম সৃষ্টি করে। আমরা তাদের যত বেশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ করতে পারবে তত বেশি তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে। কারণ একটা সুস্থ দেহ থাকলে সুস্থ মনও থাকবে। তখন তার এই মনটা এদিক-সেদিক করবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন ৪৯০টি উপজেলায় ‘মিনি স্টেডিয়াম’ নির্মাণের প্রকল্প করা হয়েছে ‘সেখানে বারো মাসই খেলাধুলা হতে পারবে’ সম্পূর্ণ আলাদা মাঠে হবে। যেন মানুষ চলতে-ফিরতে খেলাধুলা দেখতে পারে। এই কথাগুলো প্রধানমন্ত্রী এমন সময়ই বললেন যখন বাংলাদেশের যুবসমাজের একটি অংশ আজ বিপথগামী। কেউ মাদকাসক্ত হয়ে জীবনকে ও পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, অন্যদিকে কেউ জঙ্গি হয়েও দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এমন একটি সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থাকে এই ধরনের বক্তব্য শুনে আজ অনেকেই নিজ নিজ পরিবারের প্রতি নজর দেবেন আশা করি।

আজ পরিবারের মধ্যে লক্ষ করা যায়, বাবা-মা উভয়ই নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছেলেমেয়েকে দেখভাল করার জন্য আছে কাজের লোক। যাচ্ছে তারা নানা জায়গায়, টিউশনির জন্য বাইরে যাচ্ছে, কাজ শেষ করে ফিরে এলে তারা আবার ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের কম্পিউটার ল্যাপটপ, ফেসবুক অথবা মোবাইল ফোন নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যে অপসংস্কৃতির বলয়ে তারা ডুবে যাচ্ছে দিনের পর দিন, সেটা দেখবার বা বুঝবার মতো লোক আজ সংসারে যেমন নেই, তেমনি নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও, কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো আজকাল মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষার চাইতে ডিগ্রি নেবার মূল্যবোধকে প্রধান্য দেওয়া হয়। সুতরাং কোনো ছাত্রছাত্রী যদি ক্লাসে অমনোযোগী হয়, রেজাল্ট খারাপ করে, নিয়মিত অনুপস্থিত থাকে তার খোঁজ নেবার ও কাউকে খবর দেওয়ার মতো নিয়মনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই বললেই চলে। তেমনিভাবে পরিবারের লোকজনও খেয়াল করে না, কেন তার ছেলেমেয়েটি দেরিতে বাড়িতে ফেরে, অথবা রোজ রোজ এত টাকা কেন সে চায়? অথবা তার রুমটি সারাক্ষণ বন্ধ থাকে কেন? কেন সে নতুন নতুন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে কিংবা পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে : মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। বেকারদের কর্মসংস্থান করা। স্কুল-কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান এবং সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলা কার্যক্রকে বাধ্যতামূলক করা উচিত। মাদকাসক্তদের চিকিত্সা ও পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করাও আবশ্যক।

n লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং শব্দসৈনিক (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র)

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস (মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা)