মো. শহীদুল ইসলাম
২০১১ সালের পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে যে গণআন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ‘আরব বসন্ত’ হিসেবে অভিহিত করে আসছিল। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আসীন শাসকদের বিরুদ্ধে গণজোয়ার ফুঁসে উঠেছিল, সূচনা হয়েছিল ২০১০-এর ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ার শাসক বেন আলীর পতনের মধ্য দিয়ে। খুবই অল্প সময়ের মধ্য স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়। একে একে পতন ঘটে লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি, মিশরের হোসনি মোবারক, ইয়েমেনের আলী আব্দুল্লাহ সালেহের মতো দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসকদের।
২০১১ সালে যখন তথাকথিত আরব বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় এসে পড়ে তখন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ হয়তো বুঝতেই পারেননি এটির ভয়াবহতা আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। বাশার আল আসাদ জনতার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়ে এটিকে দমন করতে চেয়েছিলেন। ফলাফল হয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। সিরিয়া ধাবিত হয় গৃহযুদ্ধের দিকে। সেনাবাহিনীর একটা অংশ সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠন করে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। বহুদল, উপদলে বিভক্ত হয়ে আসাদবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী লিপ্ত হয় এই গৃহযুদ্ধে। ক্রমেই সিরিয়া হয়ে ওঠে একটি বহুমাত্রিক যুদ্ধক্ষেত্র। বিভিন্ন দেশ ক্রমেই এই যুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষকে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সিরিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ফলে এটা বিভিন্ন পক্ষের ছায়াযুদ্ধে রূপ পরিগ্রহ করে।
লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইট ওয়াচ’-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালে শুরু হওয়া এই গৃহযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখের কাছাকাছি। গৃহহীন হয়েছে ১ কোটির বেশি মানুষ। সিরিয়া পরিণত হয়েছে মৃত্যুকূপে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী আইএস-এর তথাকথিত খিলাফতের কবর রচিত হয়েছে। কিন্তু আইএস ছড়িয়ে আছে বিক্ষিপ্তভাবে। সুযোগ পেলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না এই নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট আসাদ-বিরোধীদের কোণঠাসা করতে পেরেছেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় এখনো অর্জিত হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কুর্দিদের ওপর তুরস্কের অভিযান আবার উত্তপ্ত করে তুলেছে। ডিসেম্বরের শেষদিকে হঠাত্ করেই তুরস্ক তার সীমান্তবর্তী সিরীয় কুর্দি এলাকায় সামরিক অভিযান শুরু করে। কুর্দিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ সময় তুরস্কের বেশ দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। একই সঙ্গে দেশ দুটি ন্যাটোর সদস্য। সুতরাং এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয় বিবাদ মেটানোর। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তুরস্কে আসেন এবং একটি চুক্তিতে উপনীত হন। কুর্দিরা তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা থেকে তাদের মিলিশিয়াদের সরিয়ে নেয়। তুরস্ক বারবারই বলে আসছে সিরিয়ার বিশাল শরণার্থীদেরকে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য একটা নিরাপদ অঞ্চল গঠন করা তার লক্ষ্য। আফরিনের বিশাল এলাকা থেকে কুর্দিদের প্রত্যাহারের পর তুরস্ক তার সমর্থিত বাহিনীর মাধ্যমে এসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
অন্যদিকে বিদ্রোহীদের সর্বশেষ ঘাঁটি ইদলিবে সিরিয়ার হামলায় তুরস্কের বেশ কিছু সৈন্য হতাহতের পর অবস্থা অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। তুরস্কও পালটা প্রতিশোধ নেওয়ায় দেশ দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এমন বহুমুখি সমস্যায় কবলিত দেশটিকে বাঁচাতে হলে এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তুরস্কের সৈন্য নিহতের ঘটনায় রাশিয়ার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট তুরস্কের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশ দুটির সঙ্গে তুরস্কের বেশ সখ্য আমরা দেখছি। আলোচনার টেবিল সর্বদাই যুদ্ধের মাঠ থেকে ভালো। এখন তুরস্কের সঙ্গে উদ্ভট সমস্যার একটা সমাধান আগে প্রয়োজন। অন্যদিকে ইদলিবে সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলার পর যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, এটার চূড়ান্ত একটা মীমাংসার মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একটা যবনিকা ঘটাতে হবে। অবস্থা যদি এভাবেই এগোতে থাকে তাহলে সিরিয়াতে অশান্তি আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে! কাঙ্ক্ষিত শান্তি অধরাই থেকে যাবে!
n লেখক :শিক্ষার্থী, আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ওপর স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
