নীতিমালার দাবি
মারুফা মির্জা, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা
সিরাজগঞ্জে তাঁতশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। একটি শাড়ি বা লুঙ্গি তৈরিতে ৯টি ধাপের ছয়টিতেই নারীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হলেও জেলার লাখো নারী শ্রমিক পুরুষের চেয়ে মজুরি কম পাচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা মহাজনদের বারবার বলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন করতে পারছেন না। আর কর্মজীবী এ নারীরা তাদের আইনগত অধিকার এমনকি নারী দিবস সম্পর্কেও তেমন একটা জানেন না। নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মতো এ খাতেও সরকারিভাবে নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়েছেন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন কয়েকজন। এনায়েতপুর থানার তাঁতশিল্পসমৃদ্ধ গোপীনাথপুর গ্রামের শ্রীমতি আপুচি বালা (৪৬) জানান, গাধার মতো পরিশ্রম করে যে মজুরি পাই তা দিয়ে খাওয়া খরচ চালানোই মুশকিল। তাঁতের শাড়ি কিনে পরব কীভাবে। এইতো আমাদের নারীদের পরিশ্রম। এভাবে কি আমরা চলতে পারি। যে শাড়ি তৈরিতে ভূমিকা পালন করছি, সেই শাড়ি মজুরি দিয়ে কিনতে পারি না।
আপুচি বালা আরো জানান, ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করিয়ে ছেলেকে অভাবের কারণে আর পড়াতে পারিনি। অথচ একই ভাবে পুরুষ শ্রমিক শাড়ি-লুঙ্গি বুনলে দিন ৩০০ থেকে ৫০০/৬০০ টাকা মজুরি পান। মহাজনদের বললে তারা মজুরি বাড়াবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন। তাই কী আর করা, উপায় না বুঝে এভাবেই ছোটো বেলা থেকেই কাজ করছি আমি। তার মতো মজুরি নিয়ে এমনি হতাশার কথা জানালেন, একই গ্রামের মৃত বৈদ্যনাথ সরকারের স্ত্রী বৃদ্ধা তাঁত শ্রমিক মিনতি বালা (৭০) এবং নজরুল ইসলামের স্ত্রী মরিয়ম খাতুন (৬২)। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহাজাদপুর, উল্লাপাড়া, কাজীপুর ও সদর উপজেলার দেড় লক্ষাধিক ইঞ্জিন এবং হস্তচালিত তাঁতে অন্তত কয়েক লাখ নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এ ব্যাপারে গোপীনাথপুর গ্রামের তাঁত শ্রমিক রেজাউল করিম, হজরত মোল্লা, গোপালপুরের বিশু মিয়া, ওমর আলী জানান, আমরা সারাদিন কাজ করলে ৩০০-৫০০ টাকা মজুরি পাই। আর নারীরা ১০০ টাকার উপরে পায় না। তবে তাদের চেয়ে আমরা কিছুটা ভারী কাজ করে থাকি। সে তুলনায় তাদের অন্তত ২০০ টাকা দিনমজুরি হওয়া উচিত।
এ ব্যাপারে খুকনী গ্রামের মিটন কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী হাজি শফিকুল ইসলাম, হাজি ফারুক আহমেদ, খামারগ্রামের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল তাঁতবাজার কারখানার মালিক তোফাজ্জল হোসেন বাবুল জানান, আমাদের তাঁতশিল্পে মূলত নারীরাই শতবছর ধরে কাজ করে আসছেন। তারা মজুরি কম পান মূলত ভারী কাজ না করার জন্য। তবে সবাই কম পান না। বেশি কাজ করলে বেশি পান। তবে বাজার মন্দার কারণে বর্তমানে তাদের কিছুটা কম মজুরি দিচ্ছি। আবার বাড়লেই বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ হ্যান্ডলুম পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি হাজি বদিউজ্জামান বদি জানান, তাঁতশিল্পে কর্মজীবী নারীদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। তারা যথাযথ মজুরি পাক সেটা আমি চাই। তবে বাজারের বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। বিদেশে নতুন-নতুন বাজার সৃষ্টি করে এ শিল্পের উত্পাদিত পণ্য বিক্রিতে সরকারের সহায়তা করতে হবে। তবেই বর্তমানে নুয়েপড়া শিল্প চাঙ্গা হবে। বাড়বে নারী-পুরুষ সব শ্রমিকের বেতন।
এদিকে, বেলকুচি পৌরসভার মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস জানিয়েছেন, তাঁতশিল্পে নারীর মজুরি বৈষম্য রোধে গার্মেন্ট সেক্টরের মতো সরকারিভাবে নীতিমালা তৈরি করা দরকার। নীতিমালা না থাকায় প্রধান ভূমিকা পালন করেও নারী তাঁত শ্রমিকেরা সঠিক মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিক ফেডারেশন থাকলে মালিক পক্ষের কাছ থেকে নারীরা দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে পারবে।
