পেঁয়াজ আমদানি নিয়ন্ত্রণে শুল্ক আরোপের উদ্যোগ

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২০, ২২:০৩

উদ্দেশ্য পেঁয়াজ চাষে উত্সাহিত করা

Åশিগিগরই এনবিআরে সুপারিশ পাঠাচ্ছে ট্যারিফ কমিশন

g রিয়াদ হোসেন

স্থানীয় পেঁয়াজ চাষিদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পেঁয়াজ উত্পাদনে উত্সাহিত করতে এবার আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আমদানিকৃত পেঁয়াজে শুল্ক (নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা আরডি) আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন একটি সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে। কৃষকের উত্পাদন ব্যয়ের সঙ্গে নির্ধারিত পরিমাণ মুনাফা (সম্ভাব্য ২০ শতাংশ) যুক্ত করে প্রতি কেজি পেঁয়াজ স্থানীয় বাজারে বিক্রয়মূল্য হিসেবে এ শুল্ক আরোপ করা হবে। অর্থাত্ মুনাফাসহ কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ যে দরে বিক্রি হওয়ার কথা, আমদানিকৃত পেঁয়াজের মূল্য এর চেয়ে কম হলে ঐ পরিমাণ বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হবে। ট্যারিফ কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনসহ সুপারিশ তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এ সুপারিশ পাঠানো হবে। তিনি বলেন, এই সুপারিশ কার্যকর হলে আমদানিকৃত পেঁয়াজে ঢালাওভাবে কম মূল্যে দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে না। এতে কৃষক লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবে। ফলে তারা পেঁয়াজ চাষে উত্সাহিত হলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। এতে যে কোনো দেশ থেকে হুট করে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়া কিংবা এর কারণে বাজারে অস্বাভাবিক দর বাড়ার সুযোগ কমে আসবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজ উত্পাদন মৌসুমে আমদানি বন্ধের চিন্তা করেছিল। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) নীতিমালার সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হওয়ায় ভিন্ন পথে হাঁটছে সরকার।

অবশ্য এমন উদ্যোগের সঙ্গে দ্বিমত কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের। সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হবে না। কেননা পেঁয়াজের এখন ভরা মৌসুম হলেও দাম হাতের নাগালে আসেনি। এক্ষেত্রে ‘ভোক্তার উদ্বৃত্ত’ বিবেচনায় নেওয়া দরকার। অন্যদিকে পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা হলেও তাতে প্রান্তিক কৃষক লাভবান হয় না।

গত কয়েক মাস ধরে বহুল আলোচিত ভোগ্যপণ্য পেঁয়াজ। সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কেজি দরে বিক্রি হলেও দফায় দফায় দর বেড়ে খুচরা পর্যায়ে পৌনে ৩০০ টাকায় ঠেকে। স্থানীয় উত্পাদনের বাইরে চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশ আমদানির মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে। প্রতিবেশি ভারতই বাংলাদেশের পেঁয়াজের প্রধান যোগানদাতা। কিন্তু গত বছর দেশটিতে পেঁয়াজের সংকট দেখা দেওয়ায় হঠাত্ করেই রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরপর লাগামহীন বাড়তে থাকে দর। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ, কারসাজির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের ঘোষণা এমনকি গোয়েন্দা বিভাগ কর্তৃক আমদানিকারকদের তলবের মধ্যেও পেঁয়াজের দরে লাগাম পড়েনি। এরই মধ্যে ভারতের বিকল্প হিসেবে মিয়ানমার, তুরস্ক, মিশর, চীনসহ আরো কিছু দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বেশ কয়েক মাস দেড় থেকে ২০০ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে ভোক্তাকে।

এরপরই জোর আলোচনা তৈরি হয়, দেশে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজ উত্পাদন হয় না। আলোচনায় আসে কৃষকের লোকসানের বিষয়টি। কেন না পেঁয়াজের মূল মৌসুমে আমদানিসহ কিছু কারণে পেঁয়াজের দর অস্বাভাবিক নেমে যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতি কেজি পেঁয়াজের উত্পাদনে যে পরিমাণ খরচ পড়ে, মৌসুমে বিক্রি করে কৃষক পান তার চাইতে কম মূল্য। অন্যদিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকের পক্ষে পেঁয়াজ ধরে রাখাও সম্ভব হয় না। ফলে লোকসান গুনে অনেকেই পরবর্তীতে পেঁয়াজ চাষে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বছরে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ থেকে ২৬ লাখ মেট্রিকটন। এর মধ্যে দেশের উত্পাদন বাদ দিয়ে ঘাটতি ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিকটন।