‘কী চমত্কার দেখা গেলে এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমত্কার দেখা গেল।’—সুর আর ছন্দের তালে তালে ধারাবিবরণী বায়োস্কোপওয়ালার। কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার দৃশ্য নগরজীবনে আর চোখেই পড়ে না। বায়োস্কোপ দেখাতে রাজশাহী থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে এসেছিলেন আবদুল জলিল মণ্ডল। সোনারগাঁওয়ের লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উত্সবে। খঞ্জনী আর গানের তালে বাক্সের ভেতর পালটে যায় ছবি। আর তা দেখে গল্পের জগতে হারিয়ে যায় ছেলে বুড়ো সবাই।
প্রকৃতপক্ষে বায়োস্কোপ গ্রাম বাংলার সিনেমা হল। রং-বেরঙের কাপড় পরে, ঝুনঝুনি বাজিয়ে ধারাবর্ণনা করতে করতে বায়োস্কোপওয়ালা ছুটে চলতেন গ্রামের সরু রাস্তা ধরে। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তার পেছন পেছন দৌড়াত গ্রামের ছেলেমেয়েরা। একসঙ্গে ভিড় জমালেও তিন কি চার জনের বেশি দেখতে না পারায় অপেক্ষা করতে হতো। সিনেমা হলের মতো এক শো এরপর আবার তিন বা চার জন নিয়ে শুরু হতো বায়োস্কোপ।
রাজশাহী জেলার বাঘমারা থানার চায়ের শারা গ্রামের মৃত বকশি মণ্ডলের ছেলে জলিল মণ্ডল। বাবা বকশি মণ্ডল দীর্ঘ ৪৪ বছর এ পেশায় ছিলেন। বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ১২ বছর বয়সে জলিল মণ্ডল এ পেশায় আসেন। এ পেশার আয়-রোজগার দিয়েই দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে তাঁর দিন চলে যাচ্ছে।
ঘরে ঘরে টেলিভিশন ও হাতে মোবাইলফোন আসায় এখন আর আগের মতো এর প্রতি দর্শকদের চাহিদা নেই। তবু জলিল মণ্ডল দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে এই পেশাকে ভালোবেসে বায়োস্কোপ দেখিয়ে আসছেন। এই বায়োস্কোপ দেখতে লাগে ১০/২০ টাকা। আধুনিক মাল্টি মিডিয়ার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বায়োস্কোপেও ছবি পালটান, নতুনত্ব আনেন। চেষ্টা করেন দর্শকের মনোরঞ্জনের।
‘কী চমত্কার দেখা গেলে এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমত্কার দেখা গেল।’ এভাবেই সুর আর ছন্দের তালে তালে বায়োস্কোপের কাচের জানালায় চোখ রাখলে ছবি আর বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে অজানা পৃথিবী। আর গ্রামের শিশু-কিশোরের কাছে সেটা এক নতুন পৃথিবী।
