রোমা আক্তার
‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ ক্ষণজন্মা এ মহান কবির এ দৃঢ় অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন না ঘটে তা কবিতার পাতাতেই আটকে রয়েছে। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় শিশুর মঙ্গলার্থে পরিকল্পিত রসের প্রতিফলন আজও ঘটেনি। কবির এ অঙ্গীকারকে মর্মে লালন করে শিশুর কল্যাণার্থে সরকারের কর্ম অপরিলক্ষিত। শিশু আইন ২০১৩ এবং জাতিসংঘের শিশু সনদ অনুযায়ী শিশু বলতে ১৮ বছরের কম বয়সিদের বুঝানো হয়েছে যার পরিমাণ বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ। কিন্তু পথশিশু ১৫ শতাংশের বেশি। পথশিশু নামে যে শিশুদের পরিচয় ঘটে তাদের জন্ম পথে নয়। সমাজের অক্ষমতা, রাষ্ট্র পরিচালনার অদক্ষতায় তারা আজ পথশিশু নামে ভূষিত হয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা ও বিনোদন মানুষের মৌলিক চাহিদা হলেও স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরেও নির্মল সুপ্তপ্রাণ পথশিশুরা সকল মৌলিক অধিকার থেকে চির বঞ্চিত হলেও এ বিষয়ে রাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই। দেশ-মাতৃকার আশীর্বাদস্বরূপ এই সুপ্ত প্রতীভাগুলো অনাদরে, অবহেলায় ভেসে বেড়াচ্ছে বাস, ট্রেন স্টেশন, শহরের অলিতে-গলিতে, কেউ কেউ টানছে মালামাল আবার কেউ কেউ করছে ভিক্ষা।
মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল এ দেশে আজও বিশাল সম্ভাবনাময় এ প্রাণগুলো অনাহারে, অবহেলায়, শুকনো পাপড়ির মতো ঝরে পড়ছে। দুবেলার দুমুঠো ভাত জুটানো যেখানে অসাধ্য সেখানে মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়। সারাদিন সুশীল সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছে হাত পেতেও দুমুঠো ভাত খাওয়ার পয়সা না পেয়ে তারা অনাহারে রাত্রি যাপন করে রাস্তার পাশে ইট মাথায় দিয়ে। ক্ষুধার নিরন্তর জ্বালাকে উপেক্ষা করতে না পেরে জড়িয়ে পড়ে মাদকের মতো ভয়াবহ অপরাধে। এর পশ্চাতেও রয়েছে সমাজের স্বার্থান্বেষী মুখোশধারী মানুষের হাতছানি। তারা শিশুদের ক্ষুধা প্রবৃত্তিকে পুঁজি করে বিরাট স্বার্থ হাসিলে তত্পর। মানবিক দৃষ্টি জ্ঞাপন নয় স্বার্থ হাসিলে বর্তমান সমাজের মানুষ মগ্ন। মানুষ হিসেবেও আমাদের মানসিকতায় পচন ধরেছে। তাই নিজের সন্তান মাছের মাথাটি না খেতে চাইলেও মা সন্তানকে ধমক দিয়ে বলে, ‘বাবু খাও, খেতে হবে, না খেলে বড়ো হবি কি করে?’ কিন্তু রাস্তার পাশের যে পথশিশুটি মাছের মাথাটির দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে তাকে বলে,‘যা এখান থেকে, আমার ছেলের পেট ব্যথা করবে, খাসনি জীবনে? রাক্ষস কোথাকার।’
কিছুদিন পূর্বে সিলেট রাজা ম্যানশনে বই কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল পথশিশুর এক করুণ হূদয়বিদারক দৃশ্য। সাত বছর বয়সি একটি শিশু, দুই বছর বয়সি (তার ভাই) শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে সিঁড়ির মেঝেতে শুয়ে আছে। ছোটো শিশুটির ক্ষুধাজনিত কান্না থামাতে না পেরে বড়ো শিশুটি তাকে প্রহার করছে। অথচ পাশ দিয়ে শত শত ব্যস্ত লোকের আনাগোনা, পয়সা দেওয়া তো দূরের কথা তাকানোরও সময় নেই। এই দৃশ্য দেখে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হাঁড়’ নামক ছোটোগল্পের করুণ চিত্র চোখে ভেসে উঠেছিল। সামনে ডাস্টবিন। তিন-চার জন অমানুষিক মানুষ তার ভিতর হাত দিয়ে খুঁজছে খাদ্য। একটু দূরে একটা কঙ্কালসার কুকুরের ছায়ামূর্তি। নতুন প্রতিযোগিদের কাছে ভিড়বার সাহস পাচ্ছে না। কাঠির মতো হাত-পা আর বেলুনের মতো পেটওয়ালা একটা ছোটো ছেলে দুহাতে কী চুষছে প্রাণপণে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে এ গল্প লিখলেও প্রায় ৭০ বছর পরও সেই চিত্রই দৃষ্টিগোচর হয়।
ফুলের কুঁড়ি ধ্বংস হয়ে গেলে যেমন ফুল ফুটে না, তাতে ফুলের সুবাস থেকে বঞ্চিত হতে হয় তদ্রূপ কুঁড়িরূপ নবীন প্রতিভাকে ঝরে যেতে দিলে দেশ ও জাতি প্রগতির হাতছানি থেকে বঞ্চিত হবে। তাই অগ্রগামী প্রাণগুলোর মৌলিক অধিকার পূরণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে কাজে লাগাতে হবে। তার জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে অসহায় শিশুদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রকেও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন NGO, মানবাধিকার সংস্থাসহ মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পথশিশুর কল্যাণে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে এ সকল শিশুকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে মোটিভেশন দিয়ে শিক্ষার প্রতি উত্সাহিত করে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। এভাবে অনাদৃত, অসহায় মানুষগুলোর আজন্মলালিত স্বপ্নগুলোকে পূরণ করতে পারলে জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
