কাজী আশফিক রাসেল
নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরের মধ্য দিয়ে বয়েচলা সোমেশ্বরী নদীটি একসময় ছিল অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য লীলাভূমি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গত কয়েক বছর ধরে সোমেশ্বরী নদীতে বালু উত্তোলনের নামে চলে আসছে বালুদস্যুতা। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অসাধু বালু ব্যবসায়ীরা সোমেশ্বরী নদীকে করছে ক্ষতবিক্ষত। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল ব্যাপকভাবে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদী ও নদীর তীরবর্তী সাধারণ জনগণ। সরকার পাচ্ছে নামে রাজস্ব। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দিনমজুররা। মুনাফালোভী এই সম্প্রদায়ের দৌরাত্ম্যের কারণে লড়ি-ট্রাকগুলোতে অতিরিক্ত বালু বোঝাই থেকে শুরু করে সড়কেও চলে অদক্ষ চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। প্রতিদিন হাজার হাজার বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে দুর্গাপুরের প্রতিটি রাস্তা বর্তমানে অনিরাপদ। সড়ক দুর্ঘটনা এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। বালুবাহী ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়েছে এ পর্যন্ত অসংখ্য প্রাণ। বাঙালি, গারো, হাজং, হদি, কোচ, ডালু, বানাই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এই এলাকাটি গারো পাহাড়, বিজয়পুর চীনামাটির পাহাড়, রঙিন পানির কূপ, সোমেশ্বরী নদী, সুসং রাজবাড়ি, রানীখংয়ে পাহাড়ের চূড়ায় সাধু যোসেফের ধর্ম পল্লি, টঙ্ক ও কৃষক আন্দোলনের পথিকৃ?ত্ নেত্রী হাজংমাতা শহিদ রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি ও কমলারানীর দিঘি এমন অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের কারণে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে সব সময়ই একটু আলাদা রকম আকর্ষণ। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি দুর্গাপুরে পাহাড় দেখতে এসে লাশ হয়ে ঘরে ফেরল চার শিক্ষার্থী। আহত হলো প্রায় ৩০ জনের মতো। এর আগেও আরো চার শিশু মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দুর্গাপুরের বিভিন্ন স্থানে লড়ি ও ট্রাকের চাপায় মারা যায়। সব মৃত্যুই বেদনাদায়ক কিন্তু এ ধরনের অপমৃত্যু মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। নিরাপত্তার দাবিতে স্থানীয়রা দিনের পর পর আন্দোলন করে আসলেও টনকনড়েনি প্রশাসনের। বরঞ্চ স্থানীয় প্রশাসনকে কবজায় রেখে বালু ব্যবসায়ীরা তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বীরদর্পে। যে দুর্গাপুরকে আমরা স্থানীয়রা একসময় শান্তির জনপথ বলে গর্ববোধ করতাম, সে জনপদে এখন ভয়ের রাজত্ব চলছে। ঘর হতে বের হলে বালুবাহী ট্রাক-লড়ির চাপায় পিষ্ট হওয়ার ভয়, আবার ঘাতকদের বিরুদ্ধে কথা বললেও সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিভিন্নভাবে হুমকিধমকি, অত্যাচার, নির্যাতন, হেস্তনেস্তের শিকার হওয়ার ভয়।
গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষা দুর্গাপুর ও সোমেশ্বরী নদী বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। পর্যটন শিল্পে অপার সম্ভাবনাময় এমন সম্পদ ইচ্ছামতো সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। দুর্গাপুরের সাধারণ মানুষের ও সোমেশ্বরীর দুর্দশা নিরসনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা চাই না আর একটি প্রাণ অকালে ঝড়ুক, চাই না অন্যায়, অত্যাচার, লুটতরাজ।
আমরা চাই সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
