তাগুচি আকি, হুইলচেয়ারে বসেই যিনি পরপর তিনটি প্যারা অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছেন। শারীরিক অক্ষমতা যার স্বপ্নচূড়ায় যাওয়ার পথে বাধা হতে পারেনি কখনোই। মেরুদণ্ডের রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই হাঁটার সক্ষমতা হারান তাগুচি; কিন্তু হুইলচেয়ারে বসেই তিনি লন্ডন ২০১২, বেইজিং ২০০৮ ও এথেনন্স ২০০৪ প্যারা অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন প্যারা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। একইসঙ্গে যোগ দিয়েছেন টোকিয়ো-২০২০ প্যারা অলিম্পিকের অ্যাথলেট কমেটিতে।
‘শারীরিক অক্ষমতা মানেই নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে ফেলা নয়।’— এই বার্তাই পৃথিবীর প্রতিটি আনাচে-কানাচে পৌঁছে দিতে কাজ করছেন তাগুচি আকি। সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘সমাজে অবদান রাখার মতো সক্ষমতা আমাদের আছে। আমরাও পারি। সমাজের বাকিদের মতোই আমাদের প্রতিও সবার সমান দৃষ্টিভঙ্গি বা উদ্দীপনা থাকুক, সেটাই আমাদের প্রয়োজন।’
সম্প্রতি প্যারা অলিম্পিক নিয়ে জনসচেতনতামূলক একটি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন তাগুচি আকি। চলতি মাসের ৪ থেকে ৬ তারিখের এই সফরে তিনি কথা বলেন প্যারা অলিম্পিক নিয়ে। আরো কথা বলেন সমাজের প্রতিটি মানুষ, বিশেষ করে শারীরিকভাবে বিভিন্ন অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের স্বার্থে উন্নত সমাজ গঠনের বিষয়ে।
তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলোও সমাজের জন্য কিছু করতে পারে। আমার কথাই ধরে নেওয়া যাক। ২৫ বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় পড়ে মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পাই। এরপর ২০০১ সালে শুটিং শুরু করি। এই খেলাটা পছন্দ বলে নয়, নিজেকে চার দেয়ালের বাইরে আনার জন্য। তাই নিজ পায়ে দাঁড়াতে না পারলেও বন্দুক তুলে নেই হাতে। এক সময় প্যারা অলিম্পিকে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করি। সেখানে চূড়ান্ত পর্বে জিতে ইতিহাস গড়ি।’
এ সময় বাংলাদেশের প্রতিটি শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষকে বিভিন্ন খেলায় অংশ নেওয়ার আহ্বান করেন তাগুচি আকি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশিরাও প্যারা অলিম্পিকে অংশ নিবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন,‘ আমি চাই তারা একটু সামনে এগিয়ে আসুক এবং বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনুক।’
সফরকালে বাংলাদেশের অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন তিনি। কথা বলেন প্যারা অলিম্পিকের বিষয়ে। ঘুরে দেখেন কড়াইল বস্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ সেন্টারের বিভিন্ন কার্যক্রম। এ সময় সেখানকার একটি স্কুল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি যখন স্কুলটা ঘুরে দেখছিলাম, তখন স্কুল-মাঠের একটা দৃশ্যে আমার চোখ আটকে যায়। সেখানে শারীরিকভাবে অক্ষম শিশুদের সঙ্গে বাকি শিশুরা খেলা করছিল। এই দৃশ্য বিশ্বের খুব কম দেশেই চোখে পড়ে। তবে সবখানে এমনটাই হওয়া উচিত।’
‘জাপানের টোকিয়োতে এক সঙ্গে বসতে যাচ্ছে এবারের অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকের আসর। এই দুই মঞ্চকে এক সঙ্গে করতে লেগেছে দীর্ঘ ৫৬ বছর—যেন এটাই বোঝায় যে, আমরা সবাই সমান। আমাদের অন্যভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। আমাদেরও সবার মতো একই উদ্দীপনা প্রয়োজন। আমাদের একঘরে করবেন না। আমরাও চাই একটি সুন্দর সমাজ গড়তে,’ বলছিলেন তাগুচি।
তাগুচির লক্ষ্য শুধু শুটিংয়েই নয়, বরং এই আসরে সবাই যেন নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা।
তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টের বিনিময়ে আমরা আজ এই পর্যায়ে এসেছি। তাই সবাইকে প্রেরণা দিতে চাই আমরা। এর মধ্য দিয়ে আমরা যে একেবারেই স্বাধীন হয়ে যাব, বা কোনো বাধা থাকবে না, তা কিন্তু নয়। তবে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আমরা এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। বরং প্রত্যেকের উপস্থিতিই সেখানে একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করবে।’
