কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে একটা রাজপথের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরণি। কলকাতার খ্যাতনামা কলেজ, ১৯৪৭-এ ভারতের স্বাধীনতার আগে নাম ছিল ইসলামিয়া কলেজ, এখন নাম মৌলানা আজাদ কলেজ, সেই কলেজে শেখ মুজিবুর রহমানের পড়াশোনা। কলকাতায় জীবনের বেশ কিছু বছর কাটিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই শহরের অনেক জায়গার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। ১৯৪৭-এর পর যখন যুবক মুজিবুর রহমান কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন, তখন কলকাতায় খুব বেশি মানুষ তার কথা জানত না। কিন্তু দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১-এ যখন তার নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠিত হলো, তখন তার নাম কলকাতা তথা পশ্চিম বাংলা এবং সারা ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। বাংলাদেশ গঠনের পরপর তিনি যখন ভারতে এলেন, এই কলকাতাতেই ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২-এ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের এক বিশাল জনসভায় তিনি ও ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধু, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী একসঙ্গে কলকাতার জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। যে যুবক চলে গিয়েছিলেন ’৪৭-এর পরে, ২৫ বছর পরে তিনি ফিরেছিলেন দেশনায়কের সম্মানে, গরিমায়। কলকাতার যারা ’৭১ দেখেছেন, তাদের কাছে শেখ মুজিব এক আদরের নাম। বঙ্গবন্ধু তাদের কাছে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনার সমার্থক একটি নাম।
আজ মুজিববর্ষে, যখন সারা বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ পালন করবে দীপ্ত মহিমায়, তখন কলকাতা তথা পশ্চিম বাংলা সেই উত্সবে যোগ দেবে, এটাই স্বাভাবিক। ভারতবর্ষের অন্য জায়গার বহু মানুষও নিশ্চয়ই শামিল হবে মুজিব স্মরণে। ২০২০ সালের গোড়াতে ১০ জানুয়ারি আমরা সম্পর্ক প্রকাশনা থেকে কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র রবীন্দ্রসদন চত্বরের একটি সভাগৃহে প্রকাশ করেছি ড. আতিউর রহমানের লেখা বই ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি’। এই বইয়ের ভারত ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ প্রকাশনা অনুষ্ঠান আমরা করলাম ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায়, একুশে বইমেলা চলার সময়। সেই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে লেখক আতিউর রহমানের সঙ্গে আমরা পেয়েছিলাম সৈয়দ হাসান ইমাম ও শামসুজ্জামান খানের মতো বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের। আর এখন আমরা গড়ে তুলেছি কয়েক জন বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও প্রকাশকের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ১০০ কমিটি। এই কমিটি থেকে আমরা মার্চের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশ থেকে বক্তাদের নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছি। সেমিনারের বিষয় হবে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি :আজকের প্রাসঙ্গিকতা’। পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকেরা যেমন বলবেন, তেমনি আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি বাংলাদেশের কয়েক জন প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীকে।
এই বাংলায়, এই কলকাতা মহানগরে বঙ্গবন্ধু স্মরণে যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চর্চা আসবে, তেমনি আসবে আধুনিক বাঙালির জীবনে, রাজনীতির পরিসরে বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে দুই বাংলার মধ্যে যে কাঁটাতারের পাঁচিল, সেই পাঁচিলের এপার-ওপার মিলিয়ে রাজনৈতিক বাঙালির মনে হয় সর্বকালের সেরা দুজন আইকন—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজনের কর্মকাণ্ড ১৯৪৭-এর আগে, অন্যজনের রাজনৈতিক জীবন মূলত ’৪৭-এর পরে। একজন বাঙালি হয়ে সর্বভারতীয় রাজনীতির উজ্জ্বল তারকা ১৯২০-১৯৩০-এর দশকে বাঙালি রাজনৈতিক পথচলার কান্ডারি। অন্যজন স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতির পিতা, একটা পাষাণস্বরূপ দমবন্ধ করা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রামে মানুষকে নেতৃত্ব দিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্মদাতা। মনে হয় বিংশ শতাব্দীতে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির এরাই দুজন সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক আইকন। পশ্চিম বাংলা বা কলকাতায় নেতাজি যতটা চর্চিত ও বর্ণিত, বঙ্গবন্ধু ততটা নন। বঙ্গবন্ধুর জন্মের ১০০ বছর যথার্থ মুহূর্ত, যখন আমরা পশ্চিম বাংলার নাগরিকেদের কাছে বাঙালি-অবাঙালি ভারতবাসীর কাছে নিয়ে যেতে চাই বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের, জীবনের নানান দিক।
গণতান্ত্রিক সংগ্রামের, সমাজতন্ত্রিক ভাবনার, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিভিন্ন দিক যেমন আসবে আমাদের বঙ্গবন্ধু চর্চায়, তেমনি খুব বড়োভাবে আমরা সামনে রাখব বাংলা ভাষায় সম্মানের লড়াই। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন। বাংলা তার মায়ের ভাষা, তার রাজনীতির ভাষা। কাঁটাতার পেরিয়ে আমাদের দুই বাংলার এই মায়ের ভাষা, এই আপামর বাঙালির বাংলা ভাষার মর্যাদার লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন চিরসৈনিক। স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি দুই বাংলায় প্রতিটি বাঙালির কাছে গৌরবের। আমরা এপার বাঙালিরা সেই গৌরবযাত্রায় থাকব, এছাড়া অন্যথা তো হয় না। আমাদের তাই ইচ্ছা মুজিববর্ষে বছর জুড়েই আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক আইকন বঙ্গবন্ধুকে বাংলা ভাষার রাজনৈতিক মর্যাদাকে, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার আদর্শকে প্রতিটি মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। তার জন্মের শতবর্ষে এটাই হবে আমাদের এই বাংলার বাঙালিদের তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।
n লেখক : প্রকাশক, সম্পর্ক পাবলিশিং হাউজ,
আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু ১০০ কমিটি, পশ্চিমবঙ্গ
