‘জয় বাংলা’ শুধু দুটি শব্দ নয়, এটা বাঙালির যুদ্ধ জয়ের মূল মন্ত্র। জয় বাংলাকে বাঙালির অস্তিত্ব থেকে আলাদাভাবে চিন্তা করা যায় না। ‘জয় বাংলা’ স্ল্লোগানটি তখনই ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায় যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বিভিন্ন বক্তৃতায় এটা উচ্চারণ করেছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘জয় বাংলা’ শব্দটি উচ্চারিত হতো প্রাণের টানে সাহসের বিকিরণে। আর স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর সেই ‘জয় বাংলা’ই হলো রাষ্ট্রের জাতীয় স্ল্লোগান। গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্ট এক রায়ে এই ঘোষণা দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্র। এই স্লোগান বুকে ধারণ করে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজ পর্যন্ত জাতির যে কোনো সংকটে এই স্ল্লোগানকে ধারণ করে দাবি আদায় এবং আন্দোলন-সংগ্রাম সফল হয়েছে। তাই আমরা মনে করি ‘জয় বাংলা’ই হবে রাষ্ট্রের জাতীয় স্লোগান। এই স্ল্লোগানকে কার্যকর করতে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সকল অনুষ্ঠানে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধিগণসহ সকলে ‘জয় বাংলা’ স্ল্লোগান দিয়ে যেন ভাষণ শেষ করেন। এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল এই রায় দেন।
রায়ে বলা হয়, দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাসেম্বলি শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ‘জয় বাংলা’ স্ল্লোগান দিতে হবে। যাতে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম ‘জয় বাংলা’ স্ল্লোগান সম্পর্কে জানতে পারে। সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষকে পরিপত্র জারি করে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী তিন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা চেয়ে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. বশির আহমেদ। ঐ বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ‘জয় বাংলা’কে কেন জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। ঐ রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা দেয়। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, জয় বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান। সকল জাতীয় দিবসগুলোতে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারীগণ এবং রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকর্তা সরকারি অনুষ্ঠানের বক্তব্য শেষে যেন জয়বাংলা স্লোগান উচ্চারণ করেন। কারণ জয় বাংলা জাতীয় ঐক্যের স্লোগান। জয় বাংলা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় স্ল্লোগান এবং জয় বাংলা ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের সঙ্গে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রায়ে বলা হয়, রিট আবেদনকারী সংবিধানের ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় জাতীয় স্ল্লোগান হিসেবে জয় বাংলাকে অন্তর্ভুক্তির দাবি করেছেন। কিন্তু এটা এই আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত। কারণ কোনো আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধন করার একমাত্র অধিকার জাতীয় সংসদের। তবে রাষ্ট্র ও আইন বিভাগ চাইলে সংবিধান সংশোধন করে এ বিষয়ে আইনগত সঠিক রূপরেখা প্রদান করা সম্ভব।
এই রিট মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এ বি এম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার ও রিটকারী ড. বশির আহমেদ শুনানি করেন। আদালতে আহ্বানে বক্তব্য রাখেন সাবেক আইনমন্ত্রী সিনিয়র আইনজীবী শফিক আহমেদ, আব্দুল মতিন খসরু, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এ এফ হাসান আরিফ, আজমালুল হোসেন কিউসি, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি এ এম আমিনউদ্দিন। এরা সকলেই ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্ল্লোগান হিসেবে ঘোষণার জন্য আদালতে তাদের অভিমত তুলে ধরেন। তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় স্লোগান রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জাতীয় স্লোগান হচ্ছে ‘জয় হিন্দ’। তাই ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সুকৌশলে জয় বাংলাকে বাঙালির হূদয় থেকে আলাদা করার সমস্ত অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। আমাদের সকল অর্জিত মূল্যবোধকে ধ্বংস করার মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র সত্তাকে কীভাবে আবার পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়া যায় তার সব প্রচেষ্টাই করা হয়েছে। আজ সময়ের কাটা সঠিক নিয়মেই ঘূর্ণায়মান। তাই জয় বাংলা বাঙালির আত্ম পরিচয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি উদাহরণ।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এ বি এম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৩ ও ৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা বাংলা, জাতীয় প্রতীক, জাতীয় সংগীত আছে, কিন্তু জাতীয় স্লোগান নেই। সংবিধানের ১৫০ (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ৭ই মার্চের ভাষণটি যেহেতু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ফলে রাষ্ট্রপক্ষ রিটকারীর আবেদনকে লিখিতভাবে সমর্থন করেছে।
রিটকারী ড. বশির আহমেদ বলেন, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সফল সমাপ্তি হলো। ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্ল্লোগান ঘোষণা করায় ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এই স্ল্লোগানকে বুকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ হবে।
