রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় গড়েওঠা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাশ হয়। আর বাস্তবায়ন শুরু হয় সংসদে পাশ হওয়ার প্রায় এক বছর পর গত ১ নভেম্বর। কিন্তু এ আইন প্রয়োগের শুরুতেই পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখেই আইনের প্রয়োগ অনেকটাই থমকে গেছে। আর এ শিথিলতার কারণে সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
অপর দিকে গত সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়। তাদের মূল দায়িত্ব সড়কে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরান। তবে এই টাস্কফোর্স এখন পর্যন্ত বেঠক করেছে মাত্র একটি, নেই আর কোনো অগ্রগতি। ফলে সড়কে চালকরা বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছেন যানবাহন। কখনো মুখোমুখি সংঘর্ষ, কখনো গাছের সঙ্গে ধাক্কা, সঙ্গে সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ ।
সম্প্রতি যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তার প্রায় সবগুলোর একই প্রকৃতি। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার গোপালগঞ্জে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষা সফরের বাস দুর্ঘটনায় এক শিক্ষিকার বাম হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। শিক্ষা সফরের বাসটি সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় হাত বিচ্ছিন্ন হওয়া শিক্ষিকার নাম সৈয়দা ফাহিমা বেগম (৫০)। ওই শিক্ষিকাসহ ১০ শিক্ষার্থীকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির জরিপে জানা যায়, চলতি বছরের ১০ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১১৮ জন। আর ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৮৫৫ জন, ২০১৮ সালে ছিল ৭ হাজার ২২১ জন, ২০১৭ সালে ছিল ৭ হাজার ৩৯৭ জন আর ২০১৬ সালে ছিল ৬ হাজার ৫৫ জন। এতে দেখা যায়, বিগত সময়ের তুলনায় সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
আরও পড়ুন: করোনা ভাইরাস: আক্রান্ত মানেই মৃত্যু নয়
এ ব্যাপারে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক কাজী সাইফুন নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সড়কে কারিগরি ত্রুটি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য বিশেষজ্ঞ দিয়ে ত্রুটিগুলোকে অডিট করা দরকার। কারণ ভিন্ন ভিন্ন সড়কে ভিন্ন ভিন্ন ত্রুটি রয়েছে। তিনি বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা জোরদার ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত এ কমিটির ১১১ সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যাপারে তিনি বলেন, যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার যাতে নিয়মিত চেক করা হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পাশপাশি ট্রাফিক পুলিশকে এ ব্যাপারে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ( এআরআই) গত ২০ বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাব এবং অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালনার কারণে। বাকি ১০ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে সড়কে ত্রুটি, পথচারীদের অসাবধানতা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি।
সড়কে নেই সংকেত
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ( সওজ) হিসাব মতে দেশের ৬২ শতাংশ সড়কে যথাযথভাবে সংকেত নেই। অপরদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ( বিআরটিএ) সূত্র মতে, দেশের প্রায় ৫ লাখ যানবাহনের কোনো ফিটনেস সনদ হালনাগাদ নেই। পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ ছোটো যানবাহন চলছে অবৈধভাবে।
উদ্যোগ নেওয়া হয়নি
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে একাধিক বার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নে কোনো রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনা কমাতে ২০১৮ সালের ২৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে চালককে টানা ৫ ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে না দেওয়া। চালককে এবং চালকের সহকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি বা উদ্যোগ নেই।
ইত্তেফাক/ইউবি
