মো.আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব, গবেষক
ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান বা শূন্যোদ্যান সম্পর্কে আমরা অনেকেই কম বেশী অবহিত আছি। কেননা এটি প্রাচীন যুগে বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য্যের একটি। কিন্তু এটা কীভাবে এবং কে তৈরি করেছিলেন, তা বোধহয় আমরা অনেকেই ততটা জানি না। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, এ বিশ্বে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে যতগুলো সভ্যতার (যেমন- মিশরীয়, সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, এসেরীর, ক্যালাডীয় সিন্ধু, পারস্য, হিব্রু, ফিনিশীয়, চীন, গ্রীক, রোমান, ইত্যাদি) গোড়াপত্তন হয়েছে। তার মধ্যে মেসোপটেমীয় তথা ব্যাবিলনীয় সভ্যতা মানুষের মনে তুলনামূলক যতখানি দাগ কেটেছে, অন্যগুলো ততখানি নয় বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও সভ্যতার ক্রমবিকাশের দিক দিয়ে কিছু কিছু সভ্যতা একই সময় বিভিন্ন অঞ্চল স্বকীয়তা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আবার একই সঙ্গে কেবল একটি সভ্যতা ভিত্তি করে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন নামে ধীরে ধীরে পরিবর্ধনপূর্বক উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাবিলনীয় সভ্যতাও একই আঙ্গিকে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। এটি প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম একটি। এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতা অতিপ্রাচীন হলেও শিল্পকলায় বেশ ছোঁয়া লেগেছিল। এর শিল্প শাখায় ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রকর্ম ও পূর্তকার্যে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এর একটি বড় উদাহরণ হলো এই শূন্যোদ্যান (Hanging Gardens of Babylon)। অনেক গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন যে, এটি পিরামিডের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়? এক্ষেত্রে বলতে দ্বিধা নেই যে, মেসোপটেমীয় সভ্যতার অন্যতম যে প্রধান সভ্যতা, সেটা হলো এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। উল্লেখ্য যে, ফোরাত নদীর তীরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠে জাঁক জমকপূর্ণ একটি সুন্দর শহর। এই চারকোণা শহরটি যেনো-তেনো ছিল না। এর চারদিকে ছিল প্রাচীরে ঘেরা। এর সামনে ছিল উঁচু ও মজবুত প্রবেশ পথ এবং মধ্যে মাথা উঁচু করে ছিল ব্যাবিলন টাওয়ার। এক্ষেত্রে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, ব্যাবিলন নামের সঙ্গে এর যথেষ্ট সংশ্লিষ্টতা আছে। বস্তুত: ব্যাবিলন শব্দটির উত্পত্তি সেমিটিক শব্দ ‘ব্যবইল’ থেকে; যার অর্থ হলো দেবতার নগর। আর পবিত্র বাইবেল ধর্মগ্রন্থেও ‘ব্যাবল’ শব্দের উল্লেখ আছে। খৃষ্টপূর্ব ২০০০ এর দিকে সুমেরীয় সভ্যতার যবনিকা টানার পর এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতার নেপথ্যে যদি রাজা বা সম্রাটদের কথা বলি, তাহলে উঠে আসে প্রথম সম্রাট সারগনের কথা। তিনি মোটামুটি সফল। এদিকে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা সমৃদ্ধির পেছনে ছিল সুমেরীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারা। অবশ্য এক্ষেত্রে পরবর্তী সম্রাট হাম্মুরাবির কর্মকাণ্ডও প্রণিধানযোগ্য।
সময়ের পরিক্রমায় কয়েকশো বছরব্যাপী এই সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হিট্টাইট, অ্যাসিরিয়ান, ক্যাসাইট ও ক্যালডিয়ান জাতিগোষ্ঠীর হাতে। ৬২৫ খ্রিষ্টপূর্বে ন্যানোপোলাসের নেতৃত্ব তাঁর সুদূরপ্রসারী বুদ্ধির সারথী ধরে ব্যাবিলন পুনরায় জেগে উঠে। এর মধ্যে তাঁর মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র নেবুচাদনেজার ক্ষমতায় আসেন। আর সুন্দরের পুজারি নেবুচাদনেজার ছিলেন বাবার চেয়েও এক কাঠি সরস।
তিনি ব্যাবিলনকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলেন। তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল- শিল্প, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যর প্রতি অনুরাগ। তিনি যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ-মন্দির ও স্থাপত্য পুনঃনির্মাণ করতঃ মনের মাধুরী দিয়ে ব্যাবিলন শহরকে সুরম্য ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলেন।
এতদ্ব্যতীত দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার [৬০৫-৫৬২ খৃষ্টপূর্ব] এর বিস্ময়কর আকর্ষণীয় স্থাপনা হলো ব্যাবিলনের এই শূন্যোদ্যান বা ঝুলন্তবাগান।
