সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। ফলে যে কোনো মতাদর্শের সরকারই কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা করিয়া থাকে। নির্বাচনি ইশতেহারে এবং বিভিন্ন জনসমাগম এবং সংবাদ মাধ্যমে তাহারা কী উন্নয়ন পরিকল্পনা করিয়াছেন তাহা জনগণকে জানাইয়া দেন। সেই অনুযায়ী কমবেশি চেষ্টাও করিয়া থাকেন; কিন্তু ইহা সত্য যে, জনগণের সার্বিক সহায়তা ব্যতীত দেশ আগাইয়া লওয়া খুবই দুরূহ কাজ। তাই জনগণের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হউক তাহা অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্যে গতি সঞ্চালন, যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদ ও সাবলীলকরণ এমনকি জাতির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—যে কোনো ক্ষেত্রেই। অর্থাত্ একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন জনসমষ্টিই সরকারের কর্মকাণ্ডকে সহজতর করিয়া তুলিতে পারে কেবল সহযোগিতার মানসিকতা পোষণ করিয়া। এইকথা মাথায় রাখা প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য যে, একটি দেশের ভাগ্য পরিবর্তন হইলে ব্যক্তির নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠে। আমরা উন্নতবিশ্বের দিকে তাকাইলে উহা প্রত্যক্ষ করিতে পারি। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার জনগণের মধ্যে পরিশ্রমের প্রবণতা রহিয়াছে; নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনে তাহারা সর্বোচ্চ সজাগ রহিয়াছে। তাহারা যেই মতাদর্শের নাগরিকই হইয়া থাকুক, সরকারের বিভিন্ন পরিষেবার বিষয়ে নির্দেশনাগুলি গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করে এবং সরকারকে দেশের অভিভাবক বলিয়া বিবেচনা করিয়া থাকে। কোনো সিদ্ধান্ত যদি জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলিয়া জনগণের একটি অংশের কাছে মনে হয় তখনই কেবল তাহারা আন্দোলনে নামিয়া আসে। দেশের বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ সরকারের সংস্থাগুলি করিতে গেলে কেহই বাধা প্রদানের কথা কল্পনা করে না। অবৈধ স্থাপনা, দখল সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর উচ্ছেদ করিতে গেলে মিছিল করিয়া বাধা প্রদান করে না। বর্তমানের করোনা ভাইরাস ছড়াইয়া পড়িবার বিষয়টির দিকে তাকাইলেও আমরা উহা দেখিতে পাই। ইতালির সরকার ঘর হইতে বাহির হইতে নিষেধ করিয়াছে, তাই গোটা ইতালির সাড়ে ৬ কোটি মানুষ গৃহবন্দি হইয়া আছে। যদি সরকারের কথা না শুনিত তাহা হইলে পুলিশ এবং সেনাবাহিনী নামাইয়াও দেশটির সরকারের হিমশিম খাইতে হইত। সেই কারণেই এই দেশগুলিতে আর যাই হউক অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নাই। পক্ষান্তরে, যেই সকল জাতির নাগরিকদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা, কর্মবিমুখতা এবং সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রতি অনীহা, অবহেলা ও অসহযোগিতা এবং আইন অমান্য করিবার প্রবণতা রহিয়াছে, সেই সকল দেশে অভাব, দরিদ্রতা, পশ্চাত্পদতা পিছু লাগিয়া থাকে। সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটি বিরাট অংশের মধ্যে শিক্ষার অভাব রহিয়াছে, তাহাদের বিরাট অংশ এখনো যথেষ্ট সচেতন হইয়া উঠে নাই। ফলে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আগাইয়া আসিবার প্রবণতাও বিশেষ লক্ষ করা যায় না। তবে রাজনীতিবিদদেরও কিছু দায়িত্ব রহিয়াছে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা এবং শাসন করাই নহে, মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, মানসিকতা গঠন এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতেও তাহারা দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। আমরা লক্ষ করিলেই দেখিতে পাই সামান্য যেই কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় শিক্ষিত, অতি সচেতন জনপ্রতিনিধি রহিয়াছেন, সেই এলাকার মানুষ অপেক্ষাকৃত সহিষ্ণু হইয়া উঠিয়াছে। একজন উন্নত মানসিকতার জনপ্রতিনিধিই তাহার এলাকার জনগণের মানসিকতা খানিকটা পরিবর্তন করিতে পারেন বলিয়া আমাদের ধারণা।
