শখ থেকে সফল উদ্যোগ

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২০, ২২:১৪

কবুতরকে বলা হয় শান্তির প্রতীক। আগেরকার যুগে রাজা-বাদশারা কবুতরের পায়ে বার্তা বেঁধে দিতেন। বলা যায়, তখন বার্তাবাহক হিসাবে কবুতর ব্যবহার করা হতো। অন্যদিকে, রোগীর পথ্য হিসাবেও কবুতরের মাংসের জুড়ি নেই। এছাড়া শখের বসে অনেক তরুণ কবুতর পালন করেন; কবুতর বিক্রি করে নিজেদের পকেট খরচের ব্যবস্থা করেন। সৌখিন কবুতরপ্রেমী অনেকের সফলতাই বলার মতো। সে রকমই একজন চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়া গ্রামের সামসেদ আলম। খুব অল্প সময়ে তিনি কবুতর পালনে সফলতা পেয়েছেন। বর্তমানে দুটি কবুতর ফার্মের মালিক তিনি।

শুরুটা এক জোড়া কবুতর দিয়ে হলেও এখন তার কবুতরের সংখ্যা একশ জোড়া ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় বিশ বছর আগে শুরু করা শখে কবুতর পালন এখন আর শখে সীমাবদ্ধ নেই; পরিণত হয়েছে পেশায়। সব খরচ বাদে বর্তমানে তার মাসিক আয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

শুরুর গল্পটা ভিন্ন। তখন সামশেদ আলম ছোট। মায়ের সঙ্গে নানু বাড়ি বেড়াতে যেতেন। নানুদের বাসায় রং-বেরংয়ের কবুতর পালন করা হতো। ছোট্ট সামশেদের মনে এসব দেখে কবুতর পালনের খুব ইচ্ছে হতো। কিন্তু মা বাধা দিতেন। একবার ঈদের সালামির টাকা জমিয়ে ভাইদের নিয়ে গেলেন পাড়ার এক কবুতর পালকের কাছে। ৪০ টাকা দিয়ে এক জোড়া কবুতরের বাচ্চা নিলেন। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ কবুতর কিনতে আসে সামশেদের কাছে। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিনি যতটাসম্ভব কবুতরের দাম কম রাখেন। অনলাইনেও কবুতর বিক্রি করেন তিনি।

ফেঞ্চি কবুতর পালন করার কারণ হিসাবে তিনি জানান, ‘ফেঞ্চি কবুতরের চাহিদা বেশি, এরা খুব ভালো মানের ডিম দেয় ও বাচ্চা ফোটায়। ২ মাসে এদের বাচ্চা বিক্রি করার উপযোগী হয়। অবশ্য অনেকে এক মাসের বাচ্চাও বিক্রি করে।’

তার কাছে আমেরিকান ফান্টেল, ইন্ডিয়ান ফান্টেল, লাহোর কালো হলুদ সিলবার বল্টুবার, গ্রেবার লাল বল্টুবারলেস, তুরিবাজ, ইন্ডিয়ান নোটন, বাশিরাজ কোকা, হেলনেট, জার্মান বিউটি হুমা, মাক্সি রেচার হুমা, সবজি হুমা, বারব হুমা, আমেরিকান বুম্বাইয়া, হল্যান্ড জেকোবিন এল্মোন্ড কাইট হলুদ, আমেরিকান সো কিং, মিউটিসন ফ্রিলবেক, রয়েল স্নো টাম্বলার, ইন্ডিয়ান কাল্পরা কালদম, মসাল দম, মুক্কি লাল হলুদ কফি, উজবেক টাম্বার, ঝরনা শাটিন, বোকারা, পমারিয়ান পটার ইত্যাদি প্রজাতির কবুতর রয়েছে।

সামশেদ আলমের কবুতরের খামারের নাম ‘সামশেদ পিজিওন লফট’। তিনি বাসার ছাদে খাঁচায় কবুতর পালন করেন। কিছু কবুতর ছেড়েও পালন করেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় অসংখ্য ছাদ ফাঁকা পড়ে আছে। এসব ছাদে ঘর তুলে যে কেউ অনায়াসে কবুতর পালন করতে পারে।’ 

তার মতে, বিদেশফেরত অনেকেই হতাশ হয়ে মাদক নেশায় জড়িয়ে পড়ে। তারা দু-এক জোড়া কবুতর দিয়ে শুরু করতে পারেন। তার মতে, কবুতর বিনোদনের অন্যতম উত্স। এরা খুব শান্ত ও মায়াবী পাখি। মানুষের সহচার্য খুব পছন্দ করে। যুবসমাজ অবসরে বাজে নেশায় না জড়িয়ে কবুতর পালন করতে পারে।

কবুতরের খামারের আয় দিয়ে একটি ছাগলের খামারও শুরু করেছেন বলে জানান সামশেদ। তিনি জানান, বাণিজ্যিকভাবে এই কবুতর পালন করা সম্ভব। বেকার যুবকরা কবুতর পালন করে স্বর্নিভর হতে পারে। তবে এজন্য একটু জেনেশুনে নেওয়া ভালো।

তিনি বলেন, ‘ভালো কোয়ালিটির লাহোর বা ফান্টেল কবুতর বেশ লাভজনক। সব সময় এসব প্রজাতির চাহিদা থাকে। বর্তমানে একজোড়া এস্টেন্সিল লাহোরের দাম ৫ লাখ টাকা।’ কবুতরের অসুখ হলে তিনি নিজেই চিকিত্সা করেন। সামশেদের ভাই তাকে কবুতর পালনের কাজে সহায়তা করে। সামশেদের মতে, ফেঞ্চি কবুতর পালনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামশেদ জানান, বাংলাদেশে অনেক কবুতর ব্রিডার আছেন, যারা নির্দিষ্ট প্রজাতির কবুতরের ব্রিড নিয়ে কাজ করেন। তাদের কবুতর রফতানি মানের। ভবিষ্যতে খামার আরো বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে সামশেদের। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আমাদের দেশের কবুতরের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই সরকারি সহযোগিতা পেলে কবুতর রফতানি করে বছরে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

ইত্তেফাক/বিএএফ