মিরপুরে বস্তিতে আগুন

জমির দাবিদার একাধিক পক্ষ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ০০:৪৭

মিরপুরের রূপনগরে শিয়ালবাড়ী বস্তিটি উচ্ছেদ করতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচ ও স্থানীয় একশ্রেণির নেতাকর্মীর কারণে বস্তিটি উচ্ছেদ করতে পারছিল না জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ৩০ বছর আগে শিয়ালবাড়ীর ঝিলপাড়ে এই বস্তিটি গড়ে ওঠে। প্রায় ১০ একর জমির ওপর ধীরে ধীরে ২ হাজার ঘর তোলা হয়। একশ্রেণির নেতাকর্মী সেখানে গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির লাইন সরবরাহ করেছিল। প্রতিটি ঘর থেকে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা ভাড়া উঠানো হতো। বস্তির প্রায় ১০ একর জমির মালিক জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। কয়েক দিন আগে বস্তি উচ্ছেদের জন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সেখানে মাইকিং করে। তবে এই জমির মালিকানা দাবি করে একাধিক ব্যক্তির তিনটি সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। এই বস্তির পশ্চিম পাশে ৭ নম্বর ওয়ার্ড রূপনগর আবাসিক এলাকা অবস্থিত। পূর্ব পাশে ৬ নম্বর সেকশন ট ব্লক আবাসিক এলাকা। দক্ষিণ দিকে ট ব্লকের বর্ধিত অংশ এবং উত্তর দিকে ঝিলপাড় বস্তি ও রূপনগর থানা।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেন, এই জমির মালিক জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এখানে নিম্নবিত্তদের জন্য প্রায় ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এসব ফ্ল্যাটে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন করা হবে।

ঘটনাস্থলে জমির মালিকানা দাবি করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের পুনর্বাসনের জন্য সেখানে ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করার প্রকল্প রয়েছে। অপরদিকে এই জমির বিভিন্ন অংশের মালিকানা দাবি করে কয়েকটি স্থানে সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৮ একর জমির মালিকানা দাবি করেছেন ওমর আলী মাদবর। আরেকটি সাইনবোর্ডে ওমর আলী মাদবরসহ পাঁচ জন দাবি করেছেন, তারা পৈতৃক সূত্রে ১১৭ শতাংশ জমির মালিক। বেলোয়া বিবিসহ ৯ জন আরেকটি সাইনবোর্ডে দাবি করেছেন তারা ১ একর ৮৮ শতাংশ জমির মালিক।

গতকাল ওমর আলী মাদবরের ছেলে শরীফ মাদবর বলেন, রূপনগরে মাদবর পরিবার ১০০ বছর ধরে বসবাস করছে। রূপনগর হাউজিং তাদের ১ হাজার ২০০ প্লটের জমি অধিগ্রহণ করে। বিনিময়ে তাদের পরিবারকে ৩০০ প্লট দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের দেওয়া হয়নি। শিয়ালবাড়ী বস্তির জায়গায় তাদের ৬ একর জমি আছে। ৩০ বছর আগে জমিতে ধান চাষ হতো। বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ঐ জমি থেকে মাটি কাটা হয়। ফলে সেখানে পানি জমে ঝিলের সৃষ্টি হয়। ঝিলে তারা মাছ চাষ করতেন। কিন্তু ২০ বছর আগে থেকে স্থানীয় নেতারা অবৈধভাবে সেখানে বস্তি স্থাপন করে। তারই ধারাবাহিকতা চলছে। দেড় মাস আগে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সেখানে একটি সাইনবোর্ড টানায়।

বস্তিবাসীরা জানিয়েছেন, গ্যাস, বিদ্যুতের যেভাবে অবৈধ সংযোগ ছিল তাতে যে কোনো সময় যে কোনো বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল। বুধবার তাই ঘটল। আগুনে সব পুড়ে ছাই হলো। সবার স্বপ্নও পুড়ে গেল।

বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুতের লাইনের বিষয়ে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) রূপনগর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ঐ বস্তিতে প্রায়ই অভিযান চালিয়ে অবৈধ বিদ্যুত্সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই। এর পরেও তারা চোরাইভাবে লাইন টেনে নেয়। গত সপ্তাহেও আমরা কয়েকবার সেখানে অভিযান চালিয়েছি।’

তিতাস গ্যাসের মিরপুর-১২ জোনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দায়িত্বে আসার পরে এমন কয়েকটি বস্তিতে গত তিন মাসে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানের সময় শত শত অবৈধ গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। তবে অভিযান শেষ করে আসার পর আবার তারা সংযোগ দেয়।’

তবে সরকারি জলাশয় দখলের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মোবাশ্বের চৌধুরী বলেন, ‘সেখানে টোটালি অবৈধভাবে এসব সংযোগ দেওয়া আছে। এখানে ঘর তুলে দীর্ঘ দিন ধরে তারা অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা বিষয়টি তিতাস এবং বিদ্যুত্ অফিসকে একাধিকবার জানিয়েছি। কিন্তু তারা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’