মামুনের মুজিব চিত্রমালা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ১৯:২১

পাহাড় দেখতে গেলে মানুষের চোখ ভূমি স্পর্শ করেই আকাশের দিকে ধাবমান হয়। তখন পাহাড় পরিমেয় হয়ে ওঠে আকাশের বিপরীতে। মানুষের চোখ আর ক্যামেরার ল্যান্স দৃষ্টিভঙ্গিকে পরস্পর সহযোগিতা করে চলে। চোখের অভিজ্ঞতা ল্যান্সের ভেতর দিয়ে দৃশ্যময়তাকে প্রধানত আয়ত ও পরস্ফুিট করে আঁকে। একটি অণুমুহূর্তের মধ্যেই ছবি তোলা সম্পন্ন হয়। কিন্তু ক্যামেরার শিল্পী সেই মুহূর্তখণ্ডে যে ছবি তুললেন তা তো আর কোনো জাদুবলে পেয়ে যাওয়া বিষয় নয়, তা তার যাপনের সামূহিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাওয়া নিরীক্ষার নিট ফল।

মানুষের মুখ ক্যামেরার শিল্পী নাসির আলী মামুনের সৃজন-সাধনার ভরকেন্দ্র। এত মানুষের মুখের পানে চেয়ে থাকার সাধ কেন এই আলোর শিল্পীর হূদয়ে অফুরান! আমাদের বিস্ময় জাগায়। মামুন প্রধানত ইতিহাসখ্যাত মানুষের মুখ আলোক-চিত্রায়িত করেছেন। স্বদেশের খ্যাতিমান মানুষ নয় শুধু, ছয় মহাদেশের অনেক কীর্তিমানের মুখ হয়েছে মামুনের ধ্যানবিন্দু।

কিন্তু সব ছাপিয়ে একটি মানুষ, পেছনে আকাশ না থাকলে শোভমান হয় না যার ইমেজ, যার দিকে তাকিয়ে লক্ষ লক্ষ জনতা রচিত করে মানব-সমুদ্র, যাকে পরম মমতায় এ ভুখণ্ডের মানুষেরা নাম দিয়েছে বঙ্গবন্ধু। যাকে পিতৃজ্ঞান করা অনিবার্য হয়ে যায় তাঁর কীর্তির জন্য, তাই তিনি পরিজ্ঞাত হন জাতির জনক হিসেবে। তাঁকে কিশোর মামুন দেখেছেন জনতাঘনিষ্ঠ হয়ে বক্তৃতারত ভঙ্গিতে, দেখেছেন নেতাদের মাঝে মধ্যমণি হয়ে মতবিনিময়ের একান্ত আলাপচারিতায়। সেই শৈশব থেকেই এ আলোর শিল্পী বাপ-দাদার মুখে শুনেছেন এই মহামানবের কথা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলোকচিত্রী মামুনের এক প্রধান অন্বেষা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির রূপায়ণে তিনি বিশেষভাবে ভেবেছেন। কোন আলোক সম্পাতে এই ব্যক্তিত্বের বিপুলতা পরিমাপ করতে হবে তা পরিকল্পনায় নিয়ে আবেগ ও বুদ্ধির নতুন সমীকরণ টেনেছেন এ আলোকচিত্রকর। বস্তুত ব্যক্তিকে ফ্রেমবন্দি করা যায়, ব্যক্তিত্বকে করা যায় না। সব মহত্ শিল্পকর্ম যা মানুষের মুখে আলো ফেলে রচিত হয়েছে অর্থাত্ পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি তা ফ্রেমের বন্ধন ও বন্ধনী ছিন্ন করেই দর্শকের সঙ্গে কথা বলে। মামুন মূলত মানুষের মুখের শিল্পী। যদিও তিনি যথার্থ অর্থে ফটোসাংবাদিক নন, তবুও অনেক পথে-বসে-যাওয়া অনিকেত প্রান্তজনের ছবি তুলেছেন। এ কাজটি তিনি করেছেন খানিকটা আত্মগরজে এবং তা তাকে করতে হয়েছে দৈনিক পত্রিকায় ফিচার রচনার তাগিদে। কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে পাহাড়-চূড়ায় আলোর চুম্বন দিতে চেয়েছেন মামুন; সেটাই যে এ প্রতিভার অন্বিষ্ট, তা আমরা তার তোলা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিত্রমালায় আয়ত অবলোকনে বস্ফািরিত হয়ে সবিস্ময়ে অনুভব করি। ভিন্ন পরিসরে ভিন্ন সময়ে মামুন ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আলোয় আলোয় চিত্রার্পিত করেছেন। এ আলোর শিল্পী হূদয়ে বঙ্গবন্ধু শৈশব থেকে নানা মুদ্রায় ঝলসিত হয়েছে। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রথম দেখেন বাঙালির এ অবিসংবাদিত নেতাকে। বিশেষ বিশেষ কালের বিচিত্র অভিঘাতে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়ে কী করে মুজিব নামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান একটি দেশের নির্যাতিত মানুষের ত্রাতা হয়ে উঠেছেন তা ষাটের দশকে বেড়ে ওঠা মামুন হূদয়ঙ্গম করেন। তখনও তার হাতে ক্যামেরা নেই। শিহরিত হয়ে বুঝেছেন মাত্র মানুষের নেতা হয়ে ওঠার অভিযাত্রা। ১৯৭০-এর নির্বাচনে সুযোগ এল। তখন নতুন যুবক মামুনের হাতে ক্যামেরা চলে এসেছে। এতদিনের বিস্ময়কে এবার ফ্রেমবন্দি করার সুযোগ অবাধ হলো। এতদিনে মামুনের কাঁধ কালের ভার বহনের আস্থা পেয়েছে। চোখের নিশানা হয়েছে স্থির, দৃঢ়প্রতিজ্ঞায়। দু হাতের কব্জির জোরে আর অন্তরলোকের চাপ চোখে ধারণ করে আর তা আঙুলের ডগায় প্রবিষ্ট করিয়ে আপন ক্যামেরায় মামুন তুললেন মুক্তিকামী জনতার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দীপ্র অভিব্যক্তি।

৭১-এর ৭ই মার্চের উদ্বেলিত জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধুকে মামুন ক্যামেরাবন্দি করেছেন। এত ফটোসাংবাদিকদের ভিড়ে কল্লোলিত জনসমুদ্র ভেদ করে কী করে মামুন সেদিন মঞ্চঘনিষ্ঠ হয়ে মহামানবকে কাঙ্ক্ষিত দূরত্বে দাঁড়িয়ে যথাযথ দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্রেমে বাঁধতে পারলেন তা ভেবে বিস্মিত হই। কারণ, নাসির আলী মামুন নামে কোনো ফটোগ্রাফার তখন আত্মীয়-পরিজন ছাড়া আর কারো কাছে পরিচিত ছিল না। আজ মামুন সামাজিক ও দৈশিক পরিচয়ে একজন প্রতিকৃতির আলোকচিত্রী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। দেশ ছাড়িয়ে পাশের দেশ ভারতসহ আরো অনেক দেশের অনেক মানুষের কাছে তিনি আলোর শিল্পী হিসেবে চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে ঠাঁই পেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু ৭০-এর নির্বাচনে জনসংযোগ করছেন, নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন, পাকিস্তানি দুঃশাসকদের দুরভিসন্ধি জনতাকে জানানোর জন্য ৩রা মার্চ আউটার স্টেডিয়ামে বক্তৃতা দিচ্ছেন, নেতা ও সাধারণ জনতা দুঃশাসকের গুলিতে নিহত হওয়ায় দু হাত তুলে মোনাজাত করছেন, ৭ই মার্চ জাতির দুঃখের ইতিহাস তুলে ধরে জাতিকে উজ্জীবনী মন্ত্র শোনাচ্ছেন, ৭২-এর ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরছেন বেদনামথিত হয়ে অপেক্ষমাণ জনতাকে আশায় বুক বাঁধার জন্য আবারও উত্তোলন করেছেন হাত, মুক্তিযোদ্ধারা মহান নেতার কাছে আনত শ্রদ্ধায় অস্ত্র জমা দিচ্ছেন, বঙ্গবন্ধু মুক্ত আকাশে তাঁর স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন করছেন, এভাবে অনেক ঘটনার কেন্দ্রে মহান নেতার ইমেজের চিত্রায়ণ রয়েছে মানুষের পর্যবেক্ষণে। এমন কি হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধুর অভিব্যক্তিও ফ্রেমবন্দি করেছেন মামুন। মামুনের মুজিব-চিত্রমালার কোনো কোনো ছবির সঙ্গে ফটোসাংবাদিকদের তোলা ছবির সম্পর্ক রয়েছে। ফটোসাংবাদিকদের তোলা বঙ্গবন্ধুর ছবি বিশেষ গবেষণার দাবি রাখে। সে কাজটি আজো সম্পন্ন হয়নি। সেসব ছবি ইতিহাসের অমূল্য দলিল। তবে মামুন কোনো অ্যাসাইনমেন্টের দায় সারার জন্য মহান নেতাকে চিত্রিত করেননি। তার তৃষ্ণার মধ্যে অন্য এক গভীরতার সংকেত আছে। তা যে এককভাবে মামুনের কাজেই রয়েছে তা নয়। তবে মামুনের কাজেও সেই সংকেত স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের ব্যক্তিত্বের বিরাটত্বকে আরাধনাপ্রবণ মন নিয়ে আলোর স্পর্শে অভিনব ইমেজের প্রার্থনা যেন মামুনের ছবি। বাংলার সভ্যতায় অন্তর্লীন যে আইকন-ভাবনার সারাত্সার রয়েছে তা-ই মূর্তি-ভাস্কর্য নয়, আধুনিক মাধ্যমে ফটোগ্রাফিতে তা বিশেষ প্রকাশরূপ পেয়েছে মামুনের ছবিতে; মামুন তো মূলত মানুষেরই ভজনা করেছেন; লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কাছেও তো মানুষই পরমারাধ্য।

জনসমুদ্রের মুখোমুখি আর দণ্ডায়মান আকাশের বিপরীতে, এই দুই প্রেক্ষাপট ছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অভিব্যক্তি পাঠ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই দুই রূপই ডাগরভাবে জাগর মামুনের মুজিব চিত্রমালায়। তিনি নির্বাচন করেছেন লো-অ্যাঙ্গেল ইমেজকে পর্বতপ্রমাণ মহীয়ান করার জন্য। টপ/হাই অ্যাঙ্গেলের মোক্ষম প্রয়োগ ঘটিয়েছেন সমবেত জনতার সঙ্গে মহান নেতার মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য। ব্যক্তিত্বের অপরিমেয় প্রায় উচ্চতাকে এ শিল্পসূত্র প্রয়োগ করে যারা শিল্পচর্চা করেছেন ক্যামেরার শিল্পী মামুন তাদের অন্যতম। শিল্পী শাহাবুদ্দিনের শিল্পভাবনার সঙ্গে মামুনের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্ক দুর্নিরীক্ষ নয়। শাহাবুদ্দিন কখনোই বঙ্গবন্ধুকে অবয়বের উপরিতলের কথা ভেবে ছবি আঁকেননি। জাতির জনকের চিরসংগ্রামী রূপ, অপরিমেয় তেজ, মৃত্যুকে ভ্রুক্ষেপ না করে বুক চিতিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে দুঃশাসককে হুমকি প্রদান, এসব ছবি এঁকে শাহাবুদ্দিন মুজিব-ব্যক্তিত্বের যে চিত্রভাষা রচনা করেছেন তা আমাদের শিল্পে অমূল্য অর্জন। এ কথা সত্য, মামুন সর্বার্থে এ শিল্পীর সমগোত্রীয় নন, তবে মনোভঙ্গিতে তিনি শাহাবুদ্দিনের ভাবনার অনুগামী, এমন ভাবা যেতে পারে। কারণ, মামুন বঙ্গবন্ধুর মহত্বকে আলোর ভাষায় এঁকেছেন। মুজিববর্ষে নাসির আলী মামুন তার ফটোগ্রাফি দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আলোর প্রণতি জানিয়েছেন।