একশত বছর আগের কথা। টুঙ্গিপাড়ায় সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক শিশু। পরিবারের প্রথম সন্তান। চারদিক খুশিতে ভরে ওঠে। বাবা-মায়ের আদর আর যত্নে বড়ো হতে থাকে ছোট্ট সেই শিশু। ভারি দুরন্ত আর একগুঁয়ে স্বভাব তার। যখন তখন ফুটবল নিয়ে নেমে পড়ে মাঠে। হৈ-হুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখে চারদিক। যদিও স্বভাবে খুবই ডানপিটে তবুও গ্রামের সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। আর ভালোবাসবেই না কেন? মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখলে তার যে বুক ফেটে কান্না আসত।
সেই সময় গ্রামের দরিদ্র ছেলেমেয়েরা খুব একটা স্কুলে যেত না। বই-খাতা কেনার সামর্থ্য ছিল না বেশির ভাগ মানুষের। স্কুলের এক শিক্ষকের সাথে মিলে সেই ছেলেটি একটা সমিতি বানাল। নাম দিল ‘মুসলিম সেবা সমিতি’। প্রতি রবিবার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা মুষ্ঠিভিক্ষার চাল সংগ্রহ করত। মুষ্ঠিভিক্ষা মানে হলো এক মুঠ করে চাল সংগ্রহ করা। বড়ো একটা বস্তায় সংগ্রহ করা হতো চাল। সেই চাল বাজারে বিক্রি করে গরিব ছেলেমেয়েদের বই কিনে দিত সেই সমিতি। একবার হলো কী জানো বন্ধুরা? গোপালগঞ্জ শহরে তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের দুজন মন্ত্রী এলেন। সেই ছেলেটি তখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র। শেরে বাংলা ছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী আর সোহরাওয়ার্দী ছিলেন শ্রমমন্ত্রী। দুজনের আগমন উপলক্ষে সাজ সাজ রব পড়ে গেল গোপালগঞ্জে। একটা সভার আয়োজন করা হয় দুই মন্ত্রীর আগমনে। সভা শেষ করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গেলেন মিশন স্কুল পরিদর্শনে। চশমাপরা লম্বা গড়নের তেজদীপ্ত চেহারার সাহসী এক কিশোর এগিয়ে এলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দিকে। হাতে একটা কাগজের ফুলের মালা। সেই মালা পরিয়ে দিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের গলায়। মুগ্ধ চোখে সোহরাওয়ার্দী খানিকটা সময় তাকিয়ে রইলেন তেজোদীপ্ত ছেলেটির দিকে। তারপর নিজের হাত বাড়িয়ে ছেলেটির সাথে করমর্দন করলেন। নাম জিজ্ঞেস করে ছেলেটির পুরো পরিচয় জেনে নিলেন মন্ত্রী। এরইমধ্যে ছেলেটি নির্ভয়ে তার স্কুলের সকল অভাব-অভিযোগ তুলে ধরলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে। ছোট্ট ছেলেটির আদবকায়দা আর সাহসী ভূমিকায় ভীষণ মুগ্ধ হলেন সোহরাওয়ার্দী। কাছে টেনে ছেলেটিকে অনেক আদর করলেন। ছোট্ট একটি নোটবুকে ছেলেটির ঠিকানা লিখে নিয়ে গেলেন। নিজের ঠিকানা দিয়ে ছেলেটিকেও চিঠি লিখতে বললেন। এর কিছুদিন বাদেই সবাইকে বিস্মিত করে টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটির কাছে চিঠি লিখলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। একজন মন্ত্রী চিঠি লিখেছেন ছোট্ট এক স্কুলছাত্রকে! সবাই তো অবাক।
মানুষের দুঃখ-কষ্টে ঝাঁপিয়ে পড়া সেই বিস্ময়বালক আর কেউ নয়। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর হাত ধরে জন্ম হয় বাংলাদেশের।
